রবিবার

২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৫ আশ্বিন, ১৪৩৩

রাজনীতিতে অশনিসংকেত, সরকারকে ঘিরে বাড়ছে নানা চাপ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:৪০

শেয়ার

রাজনীতিতে অশনিসংকেত, সরকারকে ঘিরে বাড়ছে নানা চাপ
প্রতীকী ছবি

ক্ষমতায় যাওয়ার সাত মাসের মধ্যেই সরকারকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক চাপ ও অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একদিকে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার হুমকি, অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর একদফা আন্দোলনের হুঁশিয়ারি। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পুলিশ ও সিভিল প্রশাসনে নানা অভিযোগ এবং অর্থনৈতিক খাতের চাপ মিলিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকার ও বিরোধী দলগুলো এখন সতর্ক না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাদের মতে, এমন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে জুলাই গণ-আন্দোলনের পর দেশ ছেড়ে যাওয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ।

ইতোমধ্যে রাজধানীতে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল, ককটেল বিস্ফোরণ ও বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় পুলিশের একটি অংশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও পুলিশের ভেতরে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের অনুসারীদের অবস্থান নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

চক্রান্তের আশঙ্কা নিয়ে বিশ্লেষকদের বক্তব্য

ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ারউল্লাহ্ চৌধুরী মনে করেন, ক্ষমতাচ্যুত রাজনৈতিক শক্তি সাধারণত রাষ্ট্রকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করে। তার মতে, বিগত দেড় দশকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল এবং সেই শক্তিই আবার ফিরে আসার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা থাকতে পারে। সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাচ্যুত গোষ্ঠী সরকারকে চাপে ফেলতে, সংকট তৈরি করতে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াতে নানা তৎপরতা চালাতে পারে।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা কম হলেও তার সহযোগীরা বিভিন্নভাবে দেশে ফিরে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি দেশের বাইরের শক্তিগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার পরামর্শ দেন তিনি।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারের মতে, আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের হুমকি এবং বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন—দুই দিক মিলিয়ে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থেকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিজেদের লোকজন বসিয়েছিল। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানে তাদের প্রভাবের বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

তবে আওয়ামী লীগের দেশে ফেরার মতো নৈতিক শক্তি নেই বলেও তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনে নৈতিক শক্তির ঘাটতি, সুবিধাবাদ ও স্বার্থনির্ভর রাজনীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।

প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

সরকারের ভেতরে ও বাইরে কারা প্রকৃত সহযোগী আর কারা সুযোগসন্ধানী—তা চিহ্নিত করতে সময় লাগছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও বিভিন্ন পেশাজীবী গোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক দোষারোপের প্রবণতাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী বিভিন্ন ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রতিযোগিতা এবং পরস্পরকে আওয়ামী লীগ বা জামায়াতের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতার কথাও আলোচনায় এসেছে। এর ফলে সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য প্রশাসনের ভেতরের অবস্থান বোঝা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনায় এ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করেন। এ ঘটনায় গোয়েন্দা তথ্য ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। পরে গুলশান মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাউদ হোসেন এবং গুলশান বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) এম তানভীর আহমেদকে পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়।

এরপর ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি মো. রাকিবুল হাসানের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। বুধবার ছড়িয়ে পড়া ওই অডিওতে তাকে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে দেশে ফেরার বিষয়ে মন্তব্য করতে শোনা যায়। একই অডিওতে সরকার, প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী নিয়েও সমালোচনামূলক বক্তব্য ছিল। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং ওসি পদায়নে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তিনি করেন।

বাসে অগ্নিসংযোগ ও ককটেল বিস্ফোরণ

শুক্রবার রাজধানীর তিনটি স্থানে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। একই রাতে ভারতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হন শেখ হাসিনা। ওই দিন রাজধানীর সাতটি স্থানে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। শনিবারও ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন দেশের ভিডিও ও ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সরকার এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরির চেষ্টা চলছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

আওয়ামী লীগের তৎপরতার পাশাপাশি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের ধারাবাহিক লংমার্চ কর্মসূচিও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন চাপ তৈরি করেছে। এর আগে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম লংমার্চ করে জোটটি। শনিবারের কর্মসূচিতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দেন, তাদের আট দফা দাবি বাস্তবায়ন না হলে তা পরবর্তী সময়ে একদফা আন্দোলনে রূপ নিতে পারে।

বিরোধী দলের এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারকে চাপ দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এর সঙ্গে আগের সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট সামাল দেওয়ার বিষয়টিও সরকারের সামনে রয়েছে।

রাজনৈতিক দলগুলোর ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া

বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল মনে করেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তার মতে, অতীতেও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা, পরবর্তী সহিংসতা এবং ওয়ান-ইলেভেনের সময় গণতান্ত্রিক রাজনীতির সংকুচিত হওয়ার উদাহরণ টেনে তিনি বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দাবি, সরকারের বাইরে যেমন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা রয়েছে, তেমনি সরকারের ভেতরেও ষড়যন্ত্রকারীরা থাকতে পারে। গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিল, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের বদলি এবং ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসির অডিওর প্রসঙ্গ তুলে তিনি সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে জুলাইয়ের ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানান তিনি।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, আওয়ামী লীগের মিছিল, হামলা ও ককটেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে রাজনীতিতে ফেরার চেষ্টা সমাজে আতঙ্ক ও নৈরাজ্য তৈরি করছে। তার মতে, সরকারের বিরোধীরাও শুরু থেকেই সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছে। প্রশাসনের ভেতরে যারা অভ্যুত্থান বা নির্বাচন মেনে নেয়নি, তাদের তৎপরতার বিষয়েও নজরদারি প্রয়োজন।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম-আহ্বায়ক মনিরা শারমিনের অভিযোগ, চলমান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও আওয়ামী লীগের নাশকতা ঠেকাতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। তার দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ককটেল বিস্ফোরণ ও ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে।

এনসিপির যুগ্ম-আহ্বায়ক মো. গোলাম সারোয়ার তুষারও সরকারের সমালোচনা করে বলেন, আওয়ামী লীগের নাশকতাকারীদের চিহ্নিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। তবে আওয়ামী লীগকে পুনরায় রাজনৈতিকভাবে দাঁড়াতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি জানান।