আবারও মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই আওয়ামী লীগকে প্রতিহতের আহ্বান। দেশের বিভিন্ন জায়গায় অস্থিতিশীলতার চেষ্টা কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের; কঠোর অবস্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে, মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ সাত শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
সর্বোচ্চ সাজার আদেশ পাওয়া অপর ছয় আসামি হলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন নিখিল এবং নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। আর এই সর্বোচ্চ সাজার রায়ের পরই যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২৪-এর সোমবার (১ জুলাই) থেকে শুরু হওয়া আন্দোলনকে সহিংসভাবে দমনের জন্য, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীসহ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের অস্ত্রধারী ক্যাডারদের সরাসরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন এই নেতারা।
লকডাউন ঘোষণা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
তবে, আইনের শাসন যখন নিজস্ব গতিতে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করছে, ঠিক তখনই এই রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে এক ভয়াল অরাজকতা সৃষ্টির গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনটির আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দেখা যায়, গত বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে অবৈধ ক্যাঙ্গারু কোর্ট আখ্যা দিয়ে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও ফরমায়েশি রায়ের বানোয়াট অভিযোগ তুলেছে।
যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিলের নির্দেশে সেই বিজ্ঞপ্তিতে আগামী রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর) ঢাকা লকডাউন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে কর্মসূচি সফল করতে বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) থেকে শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিলের ডাক দেয় তারা। আর এই লকডাউন ঘোষণার আড়ালেই রচিত হয় রাজধানী ঢাকাকে একটি মৃত্যুপুরীতে পরিণত করার নীলনকশা।
ডিসেম্বরে স্বৈরাচার শেখ হাসিনা দেশে ফিরবে এমন প্রচারণা আর রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর)-এর তথাকথিত লকডাউনকে কেন্দ্র করে, জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করতে ছুটির দিনে রাজধানীজুড়ে চালানো হয় পরিকল্পিত তাণ্ডব।
রাজধানীতে ককটেল ও অগ্নিসংযোগ
জুমার নামাজের পর মালিবাগ রেলগেট সংলগ্ন সড়কে বিকট শব্দে ফাটানো হয় পরপর দুটি ককটেল। সন্ধ্যা নামতেই স্পষ্ট হতে থাকে নাশকতার আসল রূপ। ঘড়ির কাঁটায় তখন সন্ধ্যা ৬টা। মহাখালী ফ্লাইওভারের ওপর থেকে চলন্ত গাড়ির সামনে নিচে নিক্ষেপ করা হয় একটি শক্তিশালী ককটেল। প্রায় একই সময়ে আগারগাঁওয়ের বেতার ভবনের সামনে ঘটে আরও একটি বিস্ফোরণের ঘটনা।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যখন এই স্পটগুলোতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যস্ত, ঠিক তখনই রাতের অন্ধকারে শুরু হয় নতুন তাণ্ডব। সন্ধ্যা আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিট। খোদ যাত্রাবাড়ী থানার প্রধান ফটকের সামনে একাধিক বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। মাত্র ১৮ মিনিটের ব্যবধানে রাত ৭টা ৫৮ মিনিটে বাবুবাজার ব্রিজের নিচে মাজারের সামনে ফাটানো হয় আরও একটি ককটেল। এরপর রাত ৯টা ১০ মিনিটে মগবাজার চৌরাস্তা জামে মসজিদের পাশে ঘটে আরেকটি বিস্ফোরণ।
তবে, স্পর্ধার চূড়ান্ত রূপটি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করে রাত ১০টার পর। সরাসরি কাফরুল থানার সামনেই একটি যাত্রীবাহী বাসে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।
রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দপ্তরের সামনে এমন দুঃসাহসিক অগ্নিসংযোগ প্রমাণ করে, ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়া ঠেকাতে অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
রাত ১১টার দিকে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের ঠিক বিপরীত দিকের সড়কে, যা হাতিরঝিল থানা এলাকার অন্তর্গত, সেখানে জোড়া হাতবোমা বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।
ঝটিকা মিছিল ও গ্রেপ্তার
এছাড়াও শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল ও অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিয়েছে। রাজধানীর গুলিস্তান এবং বিমানবন্দর থানাধীন কাওলা এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেছে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। এছাড়া সাভারে বিক্ষোভ মিছিল ও বোমা বিস্ফোরণের অভিযোগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
একইভাবে, মিরপুর ১১ নম্বরে শিকর বাসে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার (১৯ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার দিকে ঘটে এই ঘটনা।
রাজধানীর বাইরেও দেশের বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রয়েছে গাজীপুর এবং জামালপুর। জামালপুরেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করে তাদের অপতৎপরতা দেখানোর চেষ্টা চালায়। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। কল রেকর্ড। জামালপুর সদর থানার ওসির। দিবো।
জনমনে আতঙ্ক ও পুলিশের অবস্থান
চারপাশের এমন পরিবেশে, অনেক মানুষের চোখেমুখেই দেখা গেছে নিরাপত্তাহীনতার ছাপ। আকস্মিক ককটেল বিস্ফোরণের পর শহরের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরাজ করছে আতঙ্ক। যদিও, আওয়ামী আওয়ামী সন্ত্রাসীদের রুখে দেওয়ার প্রত্যয়ও ঝরেছে অনেকের কণ্ঠে।
নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং এই নাশকতার নেপথ্যে থাকা কুশীলবদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানায় ছাত্র জনতা।
এ বিষয়ে শাহবাগ ও মোহাম্মদপুর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি না থাকায় তারা ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
অন্যদিকে, বিমানবন্দর থানার ওসি কামরুল হাসান তালুকদার জানান, নিষিদ্ধ ঘোষিত কর্মকাণ্ড বা মিছিল করতে না পেরে অপরাধীরা অনেক সময় গাড়ি পোড়ানো বা ককটেল বিস্ফোরণের মতো নাশকতার পথ বেছে নেয়। এসব নাশকতা প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর রয়েছে বলেও জানান তিনি।
দেশবিরোধী এসব ষড়যন্ত্র রুখে দিতে রাজধানীজুড়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।
নাশকতার এই অপতৎপরতা ঠেকাতে ইতিমধ্যে শহরের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ২০০টি চেকপোস্ট বসানো হয়েছে এবং চিরুনি অভিযান চালিয়ে অরাজকতা সৃষ্টির অভিযোগে, ১৭৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির রায় শোনার পর, কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত দল এখন পুরোপুরি দিশেহারা। আদালতের রায়কে পাশ কাটাতে রবিবার (২০ সেপ্টেম্বর)-এর তথাকথিত লকডাউনের নামে তারা যে অরাজকতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে, তা রুখে দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেকপোস্ট এবং ধরপাকড় হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিচ্ছে। কিন্তু, এই নাশকতার মাস্টারমাইন্ডদের সম্পূর্ণভাবে আইনের আওতায় আনতে না পারলে সাধারণ মানুষের মনের আতঙ্ক দূর করা কঠিন হবে। এখন দেখার বিষয়, প্রশাসন কতটা কঠোর হস্তে এই অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চক্রান্ত দমন করে দেশে আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে পারে।
আরও পড়ুন:







