শুক্রবার

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩ আশ্বিন, ১৪৩৩

২১০ দিনে ৩৭১ বার অরাজকতার চেষ্টা নিষিদ্ধ আ.লীগের

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৪৫

শেয়ার

২১০ দিনে ৩৭১ বার অরাজকতার চেষ্টা নিষিদ্ধ আ.লীগের
ছবি বাংলা এডিশন

চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১০ দিনে কমপক্ষে ৩৭১ বার মিছিল ও ঝটিকা মিছিল করে অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এসব ঘটনায় ৩৮০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ১১৬টি মামলা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর ও গোয়েন্দা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এসব মিছিল থেকে হাতবোমা বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। ঝটিকা মিছিল, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণের মাধ্যমে আতঙ্ক ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। এসব মিছিল ও সহিংসতায় দেশ-বিদেশে আত্মগোপনে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অর্থায়ন করছেন বলে গোয়েন্দা সংস্থার দাবি।

বিশেষ অ্যাপে যোগাযোগ, অর্থায়নে মোবাইল ব্যাংকিং ও হুন্ডি

গোয়েন্দা সংস্থার দাবি, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পলাতক আওয়ামী লীগের নেতারা এসব মিছিলে অর্থায়ন করছেন। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ও সংগঠিত হতে তারা বিশেষ অ্যাপ ব্যবহার করছেন। মিছিলের জন্য গাড়িভাড়া ও নগদ অর্থ দিয়ে ঢাকার বাইরে থেকে লোক আনা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।

ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে কয়েকজন অর্থদাতার নাম পাওয়া গেছে। তদন্ত চলমান থাকায় তাদের নাম প্রকাশ করা হচ্ছে না। অর্থদাতাদের কেউ কেউ দেশের বাইরে আত্মগোপনে আছেন এবং মোবাইল ব্যাংকিং ও হুন্ডির মাধ্যমে মিছিলকারীদের অর্থ সরবরাহ করছেন।

তিনি বলেন, মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা পলাতক নেতাদের সঙ্গে বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে নিজেদের সংগঠিত করেছেন। অর্থদাতা ও অর্থ সরবরাহের মাধ্যম নিয়েও কাজ চলছে।

নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল ঠেকাতে কর্মকর্তাদের জবাবদিহি

দেশ অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে আইনগত ব্যবস্থা নিতে মাঠপর্যায়ে নির্দেশ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর। ঢাকা মহানগর পুলিশও একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছে।

ডিএমপি কমিশনার নির্দেশ দিয়েছেন, মহানগরীর কোনো এলাকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করলে সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)সহ দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। প্রয়োজনে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গোয়েন্দা তথ্য থাকার পরও কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের মিছিল প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ায় ডিএমপির গুলশান বিভাগের উপকমিশনার ও গুলশান থানার ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে মিছিল, তিন দিনে গ্রেপ্তার ৪০

গত ১১ সেপ্টেম্বর গুলশানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বড় ধরনের মিছিল ও শোডাউন করেন। মিছিল থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল ছোড়া হয়। ওই ঘটনার পরের তিন দিনে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার বেলা ১১টার দিকে গুলশানে ঝটিকা মিছিলের বিষয়ে আগে থেকেই গোয়েন্দা তথ্য ছিল। শুক্রবার হওয়ায় মিছিলকারীরা জুমার নামাজ আদায়কারী মুসল্লির ছদ্মবেশে ছিলেন। ওই ঘটনায় মিছিলকারী ও আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মাঝে মাঝে অপতৎপরতা চালাচ্ছেন। বিশেষ করে ফজরের নামাজের পর তারা মিছিল বের করে সেসবের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। কিছু ক্ষেত্রে দুষ্কৃতকারীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

সাভারে বাসে এসে ঝটিকা মিছিল

১৩ সেপ্টেম্বর সাভারে ভাড়া করা বাসে এসে ছাত্রলীগের কর্মীরা মিছিল বের করেন এবং কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। পরে ঘটনায় জড়িত সন্দেহে আটজনকে আটক করে পুলিশ।

ঢাকা জেলা উত্তর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক সাইদুল ইসলাম জানান, বাস রিজার্ভ করে এসে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ব্যানার ধরে ও ক্যাপ পরে ৩০ থেকে ৩৫ জন ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বিপিএটিসি এলাকায় ঝটিকা মিছিল করেন। এ সময় তারা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটান। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তারা পালিয়ে যান।

আগস্টে ১৪৩, সেপ্টেম্বরে ৩১ ঝটিকা মিছিল

পুলিশ জানায়, আগস্টে দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্রলীগের ব্যানারে ১৪৩টি ঝটিকা মিছিল বের করা হয়। এসব ঘটনায় ৪৩টি মামলা হয়েছে এবং ২০৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনে ছাত্রলীগ ৩১টি ঝটিকা মিছিল করেছে। একই সময়ে আওয়ামী লীগের ব্যানারে ২২টি মিছিল ও ৩৬টি গোপন বৈঠক হয়েছে। এসব ঘটনায় সাতটি মামলায় ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

হোটেল ও রাজধানীর প্রবেশপথে নজরদারি জোরদার

ডিএমপির একাধিক কর্মকর্তা জানান, বিভিন্ন জেলা থেকে ঝটিকা মিছিলে অংশ নিতে আসা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পলাতক নেতাদের ফ্ল্যাট ও আবাসিক হোটেলে থাকছেন। এ কারণে রাজধানীর আবাসিক হোটেলগুলোয় নজরদারি ও তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। হোটেলগুলোর অতিথি নিবন্ধন তালিকা নিয়মিত যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দিন আহমদ বলেন, প্রযুক্তিগত তদন্ত ও গোয়েন্দা তথ্যের মাধ্যমে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীরা ঢাকায় জড়ো হয়ে ঝটিকা মিছিল ও নাশকতার চেষ্টা করছেন। এ কারণে আবাসিক হোটেলগুলোর অতিথিদের তালিকা নিয়মিত সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, বহিরাগত অপরাধীরা যাতে ঢাকায় এসে অপরাধ করতে না পারে, সে জন্য রাজধানীর প্রবেশপথ ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ব্লক চেকপোস্ট কার্যকর করাসহ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের বিষয়ে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি অপরাধ সংঘটনের আগেই তাদের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

গুজব ঠেকাতে ৮৮৫টি লিংক অপসারণ

পুলিশের বিশেষ শাখার ডিআইজি পদমর্যাদার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা ফিরবেন—এমন গুজব ছড়িয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের উসকে দেওয়া হচ্ছে। পুলিশ মাঠপর্যায়ে গোয়েন্দা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, যেসব পেজ বা লিংক থেকে গুজব ছড়ানো হচ্ছে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ সংস্থার (বিটিআরসি) মাধ্যমে সেগুলো অপসারণ করা হচ্ছে। ৩০ আগস্ট পর্যন্ত বিটিআরসির মাধ্যমে ৮৮৫টি লিংক অপসারণ করা হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুলিশ কার্যকর ও সময়োচিত ব্যবস্থা নেওয়ায় বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠীর জুলাই বিপ্লবে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার অপচেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী মাঠে থাকায় নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতাকর্মীদের অরাজকতা ও দেশ অশান্ত করার পরিকল্পনা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে। আগামীতেও যেকোনো ধরনের নাশকতার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে পুলিশ ও গোয়েন্দারা সতর্ক রয়েছে।