সোমবার

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩০ ভাদ্র, ১৪৩৩

সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিমত, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে একমত

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৪

শেয়ার

সংস্কার প্রক্রিয়া নিয়ে দ্বিমত, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে একমত
ছবি সংগৃহীত

ত্রয়োদশ সংসদের শুরু থেকেই জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়ন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন বিএনপিসহ সরকারে থাকা দলগুলোর মিত্রদের সঙ্গে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের টানাপড়েন চলছে। এ ইস্যুতে উভয় পক্ষ পরস্পরকে চাপে রাখতে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। তবে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরতে না দেওয়ার প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দল ঐকমত্য বজায় রাখতে চায়।

বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে বৃহস্পতিবার শেষ হওয়া সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের সমাপনী বক্তব্যে। তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিভেদ-বিরোধ কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট অপশক্তিকেই পুনরুজ্জীবিত করতে পারে, সেই পথকেই হয়তো সুগম করতে পারে। এটি যেন আমরা ভুলে না যাই। সে ব্যাপারে অবশ্যই আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’

জুলাইয়ের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘শহিদদের প্রতি কর্তব্যের অংশ হিসেবে অবশ্যই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্র মেরামতের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় আমাদের মধ্যে ভিন্নমত থাকবে। কিন্তু, পতিত ফ্যাসিস্ট যেন আবার চেপে বসতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’

সংসদ অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানও বলেন, ‘বিগত সময়ে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা দেশ ছেড়ে পালিয়ে বিদেশে, বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশে আশ্রয় নিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং দেশকে অস্থির করার পাঁয়তারা করছেন। এসব ব্যক্তি ‘আসি আসি’ বলে ক্রমাগত ভয়ভীতি ও অপপ্রচার ছড়িয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ ঘোলাটে করছেন। এ ব্যাপারে আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’

সর্বশেষ শুক্রবার রাজধানীর গুলশান-১ নম্বরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিলের পর সরকারি ও বিরোধী দলের ভূমিকায় একধরনের ঐক্যের বার্তা পাওয়া গেছে। বিএনপি, জামায়াত ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পৃথকভাবে ঢাকায় প্রতিবাদ মিছিল করেছে।

জানা গেছে, ডিসেম্বর শেখ হাসিনার ‘দেশে ফেরা’র ঘোষণার সঙ্গে শুক্রবার গুলশানে আওয়ামী লীগের মিছিলের যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করছেন সরকারি ও বিরোধী দলের নেতারা। এ নিয়ে দুই পক্ষের দায়িত্বশীল নেতাদের মধ্যে কথাও হয়েছে। বিএনপি ও ১১ দলীয় ঐক্যের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সংস্কার ইস্যুতে দূরত্ব থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে ঐক্য ধরে রাখার লক্ষ্যে ডিসেম্বরজুড়ে দেশব্যাপী রাজপথে পৃথকভাবে নানা কর্মসূচি রাখবে সরকারি ও বিরোধী দল।

এদিন ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগ হুটহাট ঝটিকা মিছিল করলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনি আসন ঢাকা-১৭-এ মিছিল করায় পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক শক্তিগুলোও বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েছে। এরই মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গুলশান, বনানী ও বারিধারায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নজরদারি বাড়িয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও। ওই এলাকায় সন্ধ্যা থেকে রাতভর বেশ কয়েকটি চৌকি বসিয়ে যানবাহনে তল্লাশি চালানো হচ্ছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘নিষিদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। ফ্যাসিবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁনও বলেন, ‘দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে আর মেনে নেওয়া হবে না।’

এদিকে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংশোধন বা সংস্কার ইস্যুতে একে অন্যের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল নিয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। এর অংশ হিসেবে সংবিধান সংশোধনে গঠিত কমিটিতে নাম না দেওয়ায় বিরোধী দলকে একটি ছাড়া আর কোনো সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির পদ দেয়নি সরকারি দল।

জাতীয় সংসদে বিষয়ভিত্তিক স্থায়ী কমিটি রয়েছে ১১টি এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি ৩৯টি। চলতি ত্রয়োদশ সংসদের ৫০টি সংসদীয় স্থায়ী কমিটি গঠন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি পদ বিরোধী দলকে দেওয়া হয়েছে। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের এই কমিটির সভাপতি।

সরকারি দল সূত্রে জানা গেছে, বিরোধী দল সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম দিলে প্রয়োজনে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা যেতে পারে। সরকারি দল এখনো বিরোধী দল থেকে নাম পাওয়ার প্রত্যাশা করছে।

প্রসঙ্গত, সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে ১২ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করে জাতীয় সংসদ। বিরোধী দলকে ওই কমিটির জন্য পাঁচজনের নাম দিতে বলা হয়েছিল; কিন্তু তারা নাম দেয়নি। বিরোধী দল ওই কমিটি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সংশোধন নয়, তারা জুলাই সনদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কারের পক্ষে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে আগে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। সংবিধান সংশোধন করে তাতে জুলাই সনদ অন্তর্ভুক্ত করার পরই সনদ বাস্তবায়নের বিষয়টি সামনে আসবে। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ বিএনপির পক্ষ থেকে বারবারই বলা হচ্ছে, স্বাক্ষরিত জুলাই সনদে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে, বিএনপি সরকার সেটি অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে।

সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দল থেকে এখনো নাম পাওয়ার প্রত্যাশা থেকেই এ নিয়ে তাড়াহুড়ো করছে না সরকারি দল। ১৩ জুলাই গঠনের পর বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক হয় গত ৪ আগস্ট। এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র বৈঠক। শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল থেকে নাম পাওয়া যাবে, এমন আশা থেকেই ধীরে এগোচ্ছে বিশেষ কমিটি।