শনিবার

১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৮ ভাদ্র, ১৪৩৩

ইউপি নির্বাচনে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ একক প্রার্থী বাছাই

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৭:৪১

শেয়ার

ইউপি নির্বাচনে বিএনপির বড় চ্যালেঞ্জ একক প্রার্থী বাছাই
ছবি সংগৃহীত

দীর্ঘ কয়েক বছর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বাইরে থাকার পর এবার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। তবে ভোটের মাঠে নামার আগেই দলটির সামনে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নেই চেয়ারম্যান পদে বিএনপির ৭ থেকে ১২ জন সম্ভাব্য প্রার্থী মাঠে থাকায় প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলোর মোকাবিলার আগে নিজেদের একাধিক প্রার্থী সামলানোই দলটির জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।

বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছে, একটি ইউনিয়নে একাধিক দলীয় প্রার্থীকে মাঠে রাখা হবে না। জনপ্রিয়তা, সততা, দলের প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ এবং নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতা বিবেচনা করে একজনকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ নির্বাচনে গেলে কঠোর সাংগঠনিক শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

তবে তৃণমূলে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এত নেতার মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়ার পর বাকিদের কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রায় সবাই নিজেদের দলের দুঃসময়ের ত্যাগী, নির্যাতিত ও পরীক্ষিত নেতা হিসেবে দাবি করছেন।

বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয়ভাবে অংশ নেয়নি বিএনপি। দীর্ঘ সময় নির্বাচনের বাইরে থাকায় তৃণমূলের বহু নেতাকর্মীর মধ্যে এবার ইউপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান জানান দিতে অনেকেই এলাকায় জনসংযোগ, সামাজিক কর্মকাণ্ড ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী অনেক ইউনিয়নে আগেই একজন করে প্রার্থী সামনে এনেছে। ফলে বিএনপির একাধিক প্রার্থীর বিপরীতে জামায়াতের একক প্রার্থী থাকার বিষয়টিও বিএনপির তৃণমূলে আলোচনায় রয়েছে।

দলটির দায়িত্বশীল নেতারা মনে করছেন, একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলে ভোট ভাগাভাগির সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হলে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কোন্দল তৈরি হতে পারে। নির্বাচনের ফলের পাশাপাশি এর প্রভাব দলের সাংগঠনিক কাঠামোতেও পড়তে পারে।

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। বিভিন্ন জেলা ও মহানগর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একক প্রার্থী নির্ধারণের ওপর জোর দিয়েছেন। নেতাকর্মীদের দল-সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশও দিয়েছেন।

লক্ষ্মীপুরে ৯ ইউনিয়নে ৫৬৭ ফরম

একক প্রার্থী নির্ধারণের কঠিন বাস্তবতার বড় উদাহরণ লক্ষ্মীপুর সদর পশ্চিম থানা বিএনপির অধীন ৯টি ইউনিয়ন। এসব ইউনিয়নে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে ৫৬৭ জন দলীয় ফরম সংগ্রহ করেছেন।

প্রতিটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৭ থেকে ১২ জন বিএনপি নেতা ফরম নিয়েছেন। ২ নম্বর দক্ষিণ হামছাদি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আটজন এবং ৪ নম্বর চররুহিতা ইউনিয়নে ১২ জন ফরম সংগ্রহ করেছেন। সদস্য পদেও প্রতিটি ওয়ার্ডে ১০ থেকে ১৫ জন প্রার্থী ফরম নিয়েছেন।

স্থানীয় বিএনপি সূত্র জানায়, লক্ষ্মীপুর-২ সংসদীয় আসনের প্রতিটি ইউনিয়নে একজন করে প্রার্থী বাছাইয়ের লক্ষ্যে দলীয় ফরম বিতরণ করা হয়। ফরম জমা দেওয়ার পর প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক ভূমিকা ও এলাকায় কর্মকাণ্ড যাচাই করা হবে। মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শেষ পর্যন্ত একজনকে দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে।

সদর থানা পশ্চিম বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মহিউদ্দিন বিটু পাটোয়ারী বলেন, প্রতিটি ইউনিয়নে বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থীদের বিজয়ী করার লক্ষ্যেই যাচাই-বাছাই চলছে। দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো হাইকমান্ডের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা আসেনি।

তিনি বলেন, লক্ষ্মীপুর বিএনপি অধ্যুষিত এলাকা। বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে এখানে অনেকেই ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং নির্যাতিত হয়েছেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেওয়া সহজ নয়।

জামালগঞ্জে ছয় ইউনিয়নে মাঠে ১৯ জন

সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার ছয় ইউনিয়নে বিএনপির সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন ১৯ জন। ভীমখালী ইউনিয়নে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য শাহিনুর রহমান, বর্তমান চেয়ারম্যান আক্তারুজ্জামান তালুকদার এবং উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. শাহজাহান। জামায়াতের ইউনিয়ন সভাপতি হাফিজ সাইফুল ইসলাম জায়গীরদারও সম্ভাব্য প্রার্থী।

ফেনারবাক ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক চেয়ারম্যান আজাদ হোসেন বাবলু, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ফজলুল কাদের চৌধুরী তৌফিক এবং জুলফিকার চৌধুরী রানা মাঠে রয়েছেন।

সদর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ও সাবেক চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার, নূরে আলম ফরাজি, নাজিম উদ্দীন ও তৌফিকুর রহমান সম্ভাব্য প্রার্থী। জামায়াতের সদর ইউনিয়ন সভাপতি হাবিবুর রহমানও রয়েছেন প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে।

সাচনা বাজার ইউনিয়নে উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মাসুক মিয়া, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান তালুকদার, ইউনিয়ন আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আব্দুন নূর আখুঞ্জি, মিছবাহ উদ্দিন রুমি ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব জায়েদ আহমদ প্রার্থী হতে আগ্রহী।

উত্তর ইউনিয়নে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আলী আক্কাস মুরাদ এবং জামায়াতের কর্মী কামাল হোসেন সম্ভাব্য প্রার্থী। বেহেলী ইউনিয়নে রয়েছেন জেলা কৃষক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক সাইফুজ্জামান উকিল, উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সামছুজ্জামান ধন মিয়া, ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি আলম আখুঞ্জি এবং ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নজির আলি।

ফেনীতে এক ইউনিয়নে ১১ চেয়ারম্যান প্রার্থী

ফেনী সদরের মোটবী ইউনিয়নে বিএনপির ১১ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন মীর মোশাররফ হোসেন (মানিক), শাহ আলম, নিজামুদ্দিন, ফখরুল ইসলাম (মাসুক), দেলোয়ার হোসেন, গোলাম মহিউদ্দিন ভূঁইয়া, ইসমাইল হোসেন ও রাকিব উদ্দিন। এছাড়া বিএনপি ঘরানার প্রবাসী রহমান রাজু, নুরুল আমিন ও আবুল কালাম মজুমদারও চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চান।

পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নেও বিএনপি থেকে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী সাতজন। তারা হলেন দেলোয়ার হোসেন দেলু, কামাল উদ্দিন আহমেদ, কাবুল হোসেন, নুর নবী, কামাল উদ্দিন মজুমদার, মওদুদ আহমেদ রনি ও ইঞ্জিনিয়ার আলমগীর কবির।

একজনকেই সমর্থন দেবে বিএনপি

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, বিএনপি দীর্ঘদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তাই এবার অনেকে প্রার্থী হতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক। তবে ইউপি নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করতে একজনকেই দলীয় সমর্থন দেওয়া হবে।

তিনি বলেন, শুধু ত্যাগী বা নির্যাতিত হলেই দলীয় সমর্থন পাওয়া যাবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সৎ, দলের প্রতি অনুগত, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখেন এবং নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার সক্ষমতা রাখেন, তাকেই সমর্থন দেওয়া হবে। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কেউ নির্বাচনে অংশ নিলে কঠিন শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকানোই বড় পরীক্ষা

ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে একজনকে বেছে নেওয়ার পর বাকিরা কী করবেন, এ প্রশ্নই এখন বিএনপির তৃণমূলে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের প্রত্যেকেই নিজেদের দুঃসময়ের ত্যাগী হিসেবে তুলে ধরছেন।

তৃণমূলের একটি অংশের অভিযোগ, দলের কঠিন সময়ে এলাকায় ছিলেন না, এমন অনেক নেতাও এখন এমপি-মন্ত্রীদের প্রভাব কাজে লাগিয়ে চেয়ারম্যান হওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের ঠেকাতেও কেউ কেউ প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এ কারণে প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় সামান্য ভুলও স্থানীয় পর্যায়ে বড় বিরোধ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিএনপির নেতারা।

সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির তৃণমূলেও প্রার্থী বাছাই নিয়ে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরেই তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা

এদিকে নির্বাচন কমিশনও ইউপি নির্বাচনের প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠু করতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের আয়োজন করা হতে পারে। সংলাপ হলে আগামী মাসে তফসিল হতে পারে। আর সংলাপ না হলে চলতি সেপ্টেম্বরের শেষদিকে তফসিল ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে।

সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরের মধ্যেই ধাপভিত্তিক ইউপি নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

বিএনপির সামনে তিনদিকের চ্যালেঞ্জ

তফসিল যত এগিয়ে আসছে, বিএনপির সামনে তত স্পষ্ট হচ্ছে তিনদিকের চ্যালেঞ্জ। প্রথমত, নিজ দলের একাধিক প্রার্থীকে একজনের পেছনে ঐক্যবদ্ধ করা। দ্বিতীয়ত, জামায়াত ও এনসিপির প্রার্থীদের মোকাবিলা করা। তৃতীয়ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনি মাঠে আসা ঠেকানো বা মোকাবিলার কৌশল ঠিক করা।

স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ধারণা, আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী বর্তমানে পলাতক থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় ভেতরে ভেতরে একজন করে প্রার্থী ঠিক করে মাঠে নামার চেষ্টা করতে পারেন। তবে তাদের মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরা আগে থেকেই মাঠে সক্রিয়। এনসিপিও ইউপি নির্বাচনে এককভাবে প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ইউপি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজেদের ঘরের একাধিক প্রার্থীর প্রতিযোগিতাকে দলীয় ঐক্যে রূপ দেওয়া। একক প্রার্থী নির্ধারণের পর বিদ্রোহী প্রার্থী ঠেকাতে পারা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের মোকাবিলায় সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখাই এখন দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।