বৃহস্পতিবার

৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৯ ভাদ্র, ১৪৩৩

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা ছিলেন সরব অভিযোগের তীর এখন তাদেরই দিকে!

নিউজ ডেস্ক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৮:১৬

শেয়ার

দুর্নীতির বিরুদ্ধে যারা ছিলেন সরব অভিযোগের তীর এখন তাদেরই দিকে!
ছবি সংগৃহীত

একটা সময়ে, দুর্নীতি-অনিয়মের বিরুদ্ধে আপসহীন কণ্ঠস্বর। রাষ্ট্র মেরামতের বড় বড় প্রতিশ্রুতির ফাঁকা বুলি।

কিন্তু ক্ষমতার স্বাদ গ্রহণের পর, সেই আদর্শ কি বহাল ছিলো? নাকি নীতির জায়গা দখল করে নেয়, স্বার্থ আর সুবিধাবাদের এক নতুন অধ্যায়? একসময় যারা দুর্নীতি আর অনিয়মের বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বলে ক্ষমতার অলিন্দে জায়গা করে নিয়েছিলেন, সময়ের পালাবদলে অভিযোগের তীর এখন তাদেরই দিকে।

আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান

সম্প্রতি, সাবেক উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান, দেশজুড়ে সৃষ্টি করেছে নানা আলোচনা-সমালোচনার। বদলি ও নিয়োগ বাণিজ্য থেকে শুরু করে পদোন্নতির অনিয়ম—সাবেক এই উপদেষ্টার বিরুদ্ধে অভিযোগের তালিকাটি বেশ লম্বা।

তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন। বুধবার (২ সেপ্টেম্বর), এই তথ্য জানায় দুদক। ফলে, প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় এই অভিযোগ অনুসন্ধান করবে সংস্থাটি। আসিফ মাহমুদ ছাড়াও, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবুল আলম, যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জুবায়েদ হোসেন এবং উপসচিব মাসুম আহমেদের বিরুদ্ধেও অনুসন্ধান করার কথা জানিয়েছে দুদক।

এদিকে, দুদকের অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে, মানহানীর অভিযোগ তুলেছেন আসিফ মাহমুদ।

অন্যান্য সাবেক উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

অন্যদিকে, সাবেক উপদেষ্টাদের মধ্যে অভিযোগের এই খাতা শুধু আসিফ মাহমুদকে ঘিরেই নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আরও কয়েকজন সাবেক উপদেষ্টার বিরুদ্ধেও বিভিন্ন সময়ে উঠেছে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। সেই তালিকায় আছেন সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল ও ওই সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। এমনকি নতুন রাজনৈতিক শক্তির সামনে থাকা, ছাত্রনেতাদের বেশ কয়েকজনকে ঘিরেও উঠেছে নানা প্রশ্ন।

জানা যায়, অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে আসিফ নজরুল ও তার পরিবার ক্ষমতার ছত্রছায়ায় রাতারাতি গড়ে তুলেছিলেন অনৈতিক সম্পদ ও কালো টাকার অন্ধকার সাম্রাজ্য। অভিযোগ রয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই আসিফ নজরুল হাতিয়ে নিয়েছেন শত শত কোটি টাকা।

সেইসঙ্গে, তার বিরুদ্ধে জামিন বাণিজ্য নিয়েও কয়েকশ কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। সেসময় শেয়ার জালিয়াতি ও ভাই হত্যার মামলায় ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমানের জামিনের বিষয়টিও উঠে আসে। একদিনে তিনটি মামলার জামিন—এমনকি, যে আদালত সিমিনকে জামিন দিয়েছে, সেই আদালতের জামিন দেয়ার এখতিয়ারও ছিল না বলে জানা যায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই জামিনের বিনিময়ে আসিফ নজরুলের বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের কারণেই আদালত সিমিন রহমানকে জামিন দিয়েছেন। এছাড়াও অর্থের বিনিময়ে ফ্যাসিবাদের দোসর ও বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতাদের জামিন দিয়ে বাইরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন বলেও, নানা সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছেন সাবেক এই উপদেষ্টা।

আইন মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাও ছিলেন আসিফ নজরুল। কিন্তু অভিযোগের তীর যেন শেষ হওয়ার নয়। এখানেও তার বিরুদ্ধে উঠেছে দুর্নীতি, অনিয়ম আর নতুন করে রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স দেয়ার মাধ্যমে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ।

এমনকি, তার সাবেক স্ত্রী রোকেয়া প্রাচীর দুই কন্যাও রাতের আঁধারে আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার মতো সম্পদের মালিক হয়েছেন—এমন তথ্যও পাওয়া যায়। ওই দুই সন্তানের মধ্যে একজনের নামে ঢাকার নিউ ইস্কাটনে একটি বাড়ি কেনা হয়েছে বলে জানা যায়।

রিজওয়ানা হাসান ও ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ

অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক আরেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধেও দুর্নীতি নিয়ে উঠে এসেছে নানা তথ্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, ক্ষমতার পালাবদলের পর, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দখলে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে রিজওয়ানার বিরুদ্ধে।

এছাড়াও, উপদেষ্টা থাকাকালীন সময়ে সেন্টমার্টিন, পলিথিন নিয়ে করা সিন্ডিকেটসহ নানা কারণেও বিতর্কিত হয়েছেন রিজওয়ানা।

অপরদিকে, ২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান থেকে উঠে আসা, একাধিক ছাত্রনেতার বিরুদ্ধেও উঠে এসেছে দুর্নীতির নানা চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অভিযোগ। সারজিস আলম, মাহফুজ আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে উঠেছে এসব অভিযোগ।

২৪-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো দেশের ভাগ্য পাল্টাবে। দেশের নতুন নেতৃত্ব পাল্টে দেবে সব। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতা গ্রহণের পূর্বে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে কণ্ঠ ছিল কঠোর, ক্ষমতার পালাবদলে তারাই জড়িয়ে পড়ে দুর্নিতীতে। সব মিলিয়ে, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টাসহ, তরুণ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি বিশ্লেষকদের।