রাজনীতিতে ভোল বদল ও সুবিধাবাদী আচরণের অভিযোগে সমালোচিত গণ-অধিকারের সাবেক নেতা রাশেদ
২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনের দীর্ঘ ৬ বছর পর এক অভাবনীয় সিদ্ধান্ত নিল ঢাবি প্রশাসন। ভূয়া এমফিল ভর্তির দায়ে ছাত্রলীগের গোলাম রাব্বানীর পদ বাতিলের পর, দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৬৩ ভোট পাওয়া মো. রাশেদ খানকে নতুন জিএস ঘোষণা করেছে সিন্ডিকেট। এ নিয়ে রাশেদ ফেসবুকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ লিখে স্বস্তি প্রকাশ করলেও, প্রশ্ন উঠেছে বর্তমানে যেখানে এস এম ফরহাদ ডাকসু জিএস পদে রয়েছেন, সেখানে ৬ বছর পর পাওয়া এই বিলম্বিত জিএস পদবী নিয়ে এখন কী করবেন রাশেদ খান? ডাকসুর নিয়ম ও ইতিহাসে এটি কি কেবলই অলংকারিক পরিচিতি, নাকি রাজনৈতিক সুবিধা নেয়ার নতুন বাহন?
আইনি সুযোগ নেই দায়িত্ব গ্রহণের
গোলাম রাব্বানীর ছাত্রত্ব বাতিলের পর রাশেদ খানকে শূন্য পদে জিএস ঘোষণা করা হলেও, বাস্তবে তার কোনো দায়িত্ব গ্রহণ বা সক্রিয় হওয়ার আইনি সুযোগ নেই বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সুব্রত দেবনাথ রানা।
এছাড়াও, আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি স্রেফ একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণামাত্র। এর মাধ্যমে ডাকসুতে নতুন করে কোনো কার্যক্রম চালানোর বা ক্ষমতা চর্চার সুযোগ রাশেদের নেই বলে জানান এই আইনজীবী।
দীর্ঘদিন পর ন্যায়বিচার পাওয়ার দাবি করলেও, বর্তমানে রাশেদের অসংলগ্ন রাজনৈতিক বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক।
সব কিছুতেই জামায়াতকে টানেন
সম্প্রতি অর্থনৈতিক সংকট বা বাজারদর নিয়ে টকশোতে প্রশ্ন করা হলেও, প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বিরোধীদল, বিশেষ করে জামায়াতের দুর্নীতির কথা টেনে আনেন গণ অধিকার পরিষদের সাবেক নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর বর্তমান রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খান। প্রশ্ন না বুঝেই উত্তর দেয়া নিয়েও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাকে নিয়ে হচ্ছে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ।
জামায়াত-শিবির ১৬ বছর গুপ্ত ছিল, বাড়াবাড়ি করলে আবার গুপ্ত করা হবে’এমন হুংকার দিলেন রাশেদ।
অন্যদিকে, গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক পদে থেকে গোপনে বিএনপির হয়ে কাজ করা এবং পরবর্তীতে বিএনপি-তে যোগ দেয়া রাশেদ নিজেই ‘গুপ্ত’ রাজনীতির উদাহরণ বলে মনে করে সমালোচকরা।
সমালোচনা রয়েছে, গণঅধিকার পরিষদ ২০০ আসনে প্রার্থী দেয়ার ঘোষণার পর নিজের আসন সুনিশ্চিত করতে বিএনপি-তে ভেড়েন তিনি। সাধারণ মানুষের সাথে এই রাজনৈতিক বিশ্বাস ভঙ্গকে ‘স্ত্রীর সাথে আলোচনার ভিত্তিতে ডিভোর্স নেয়া’র সাথে তুলনা করলে নেটিজেনদের তীব্র বিদ্রূপের মুখে পড়েন রাশেদ।
গণঅভ্যুত্থানের সাথে প্রথম বেইমানি করেছেন জামায়াত আমীর, এমন মন্তব্যের পাশাপাশি আবার কখনো জামায়াতে ইসলামীর গায়ে সেঁটে দিয়েছেন ‘জালেম’ তকমা। বিভিন্ন সময়ে জামায়াতবিরোধী অবস্থানে সোচ্চার রাশেদ খান।
নির্বাচনি হারের ক্ষোভ থেকে বিরোধিতা
তবে, সব কিছুতেই কেন জামায়াতকে টানেন রাশেদ? এমন প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে রয়েছে নির্বাচনি ফলাফলে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঝিনাইদহ-৪ আসনে বিএনপির টিকিটে লড়ে, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে শোচনীয়ভাবে হেরে যান তিনি। মূলত এই নির্বাচনি হারের চরম ক্ষোভ ও বেদনা থেকেই তিনি, অনবরত জামায়াতের বিরোধিতা করেন বলে মনে করে সমালোচকরা।
নিজের এই জামায়াত বিরোধিতার ব্যাখ্যায় রাশেদ খান দাবি করেন, বিদেশীদের সাথে শরিয়া আইন না করার কথা বলা, অথচ সংসদে আল্লাহর আইন চাওয়ার যে দ্বিচারিতা ও মুনাফিকি জামায়াত করছে, তার কারণেই তিনি সোচ্চার। একইসাথে কর্নেল অলী আহমেদের জনসভার উদ্ধৃতি ও অতীতে আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের জোট বাঁধার প্রসঙ্গ টেনে আনেন তিনি।
নির্বাচনে পরাজিত হলেও ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক সহকারীর সচিব পদমর্যাদা দায়িত্ব পান রাশেদ। নিজের কাজ সম্পর্কে তিনি জানান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণ, লিয়াজোঁ বজায় রাখা, তৃণমূল পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরোধীদের অপপ্রচারের বিপরীতে সরকারের সঠিক তথ্য তুলে ধরাই তাঁর প্রধান কাজ।
শুধু টকশোতেই নয়, বিভিন্ন জনসমক্ষে অতিরিক্ত প্রভাব খাটানোর চেষ্টা কিংবা রাস্তায় একা হেঁটে হাত নাড়িয়ে সাড়া না পাওয়ার মতো একাধিক ঘটনায় হাস্যরস ও বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন তিনি।
এদিকে, সম্প্রতি এক পোস্টে রাশেদ দাবি করেন, ‘২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের চেয়ে ৭১-এ বেশি রক্ত ঝরিয়েছে জামায়াত, সে তুলনায় আওয়ামী লীগের অপরাধ লঘুই বলা যায়।’ একইসাথে জামায়াত-এনসিপি আওয়ামী লীগকে নিয়ে দেশ অশান্ত করবে বলে মন্তব্য করেন। আর এই পোস্টে নেটিজেনরা তাঁকে ‘সুবিধাবাদী তোষামোদকারী’ ও ‘সস্তা ভিউ প্রত্যাশী’ বলে ক্ষোভ ঝাড়েন।
অভিযোগ রয়েছে, এর আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে চলা সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকেও বিতর্কিত করতে তিনি দাবি করেন, এই বিক্ষোভের পেছনে শিবিরের উসকানি রয়েছে।
এসবের মাঝেই, একসময় শেখ হাসিনাকে ‘মমতাময়ী মা’ ডাকা এই নেতার বিরুদ্ধে, ৫ আগস্টের পর রাতারাতি ভোল পাল্টানোর অভিযোগ উঠেছে।
রাজনীতিতে আদর্শহীন ও সুবিধাবাদী চরিত্রের তকমা পাওয়া, রাশেদ খানের ৬ বছর পর পাওয়া ডাকসু জিএস পদের বিলম্বিত স্বীকৃতি, তাঁর রাজনৈতিক অস্তিত্বকে পুনরুদ্ধার করবে, নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দিবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।
আরও পড়ুন:







