ক্যালেন্ডারের পাতায় দুই বছর আগের সেই রক্তঝরা জুলাই। যে জুলাইয়ের প্রতিটি দিন লেখা হয়েছিল তরতাজা রক্তের অক্ষরে, যে জুলাইয়ের বারুদের গন্ধে কেঁপে উঠেছিল দেশের এক লক্ষ ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল এলাকা। এক অভূতপূর্ব আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য থেকে শাহবাগ পর্যন্ত পুরো রাজপথ রূপান্তরিত হয়েছিল এক বিশাল মানবসমুদ্রে।
কেবল রাজধানী ঢাকাতেই নয়, সেই ডাক দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায়। সাধারণ মানুষের বুকচিটিয়ে দেয়া প্রতিরোধে ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের ইস্পাতকঠিন স্বৈরাচারী শাসন আমল।
দুই বছর পর নিঃসঙ্গ বাস্তবতা
কিন্তু, ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস। ঠিক দুই বছর ঘুরে সেই একই জুলাই মাসে এসে এক চরম নিঃসঙ্গ, বিষাদময় ও কোণঠাসা বাস্তবতার মুখোমুখি তৎকালীন সামনের সারির নেতৃত্ব এবং তাদের গড়ে তোলা নতুন রাজনৈতিক দল ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ বা এনসিপি।
লাখো তরুণের স্বপ্ন আর হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে যে নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্ম হয়েছিল, আজ তাদের কর্মসূচিতে কেন সেই চেনা উত্তাপ আর জনস্রোত নেই, উল্টো বাধা ও হামলার শিকার হতে হচ্ছে, তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। যে বুলেটবিদ্ধ মুখের সারি একদিন জীবন বাজি রেখে দাঁড়িয়েছিল সামনের কাতারে, তারাও আজ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এই নতুন নেতৃত্বের দিক থেকে? এই দূরত্ব কি কেবল সময়ের ব্যবধান, নাকি বিশ্বাসভঙ্গের এক গভীর ও গোপন ক্ষতের পরিণতি?
স্বপ্ন পূরণ ও নেতৃত্বের সমালোচনা
গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজপথের লড়াকু যোদ্ধাদের চাওয়া ছিল একেবারেই স্পষ্ট, রাষ্ট্রের জরাজীর্ণ কাঠামোর মৌলিক সংস্কার, বৈষম্যহীন এক নতুন সমাজ বিনির্মাণ এবং জুলাইয়ের শহীদ ও আহত পরিবারের স্থায়ী ও সম্মানজনক পুনর্বাসন। কিন্তু সময় যতো গড়িয়েছে, সাধারণ মানুষের সেই মৌলিক চাওয়াগুলো যেন ক্ষমতার মায়াবী অলিন্দে কোথাও হারিয়ে গেছে।
নেতৃত্ব আর সাধারণ কর্মীদের মাঝখানে রচিত হয়েছে এক অদৃশ্য প্রাচীর, যা দিন দিন এনসিপিকে সাধারণ মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে পরিণত করছে বলেই সমালোচনা চলছে। মাঠের নির্মম বাস্তবতা বলছে, নতুন রাজনীতির যে স্বপ্নীল প্রতিশ্রুতি তারা দিয়েছিল, তা বাস্তবায়নের চেয়ে ক্ষমতার হিসেব-নিকেশ আর আসন সমঝোতার রাজনীতিই এখন তাদের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিযোগের আঙুল এখন সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে। জুলাই অভ্যুত্থানে যারা নিজেদের বুকের রক্ত ঢেলে দিয়ে স্বৈরাচারের পতন ঘটিয়েছিল, সেই আহত ও শহীদ পরিবারের যথাযথ খোঁজখবর রাখা কিংবা তাদের চিকিৎসায় রাষ্ট্রীয় সর্বাত্মক অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার চেয়ে, নিজেদের ক্ষমতার আসন পাকাপোক্ত করার ব্যস্ততাই যেন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই তীব্র ক্ষোভের সাথে বলছে, যাদের জীবনের বিনিময়ে আজকের এই মুক্ত বাতাস, তাদের হাসপাতালের বিছানায় ফেলে রেখে কেবল গুটিকয়েক সমন্বয়ক বা শীর্ষ নেতার ক্ষমতার মোহ এবং গোষ্ঠীস্বার্থই এখন প্রধান হয়ে উঠেছে। আন্দোলনের মূল আত্মাকে বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারাতেই যেন মত্ত দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা ও দুর্নীতির অভিযোগ
রাজপথের এই নীরবতা এখন রূপ নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তীব্র গর্জনে। এনসিপির নেতৃত্ব নিয়ে বইছে সমালোচনার অবিরাম ঝড়। জুলাইয়ের বীর শহীদদের সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমান নেতৃত্বের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ও জীবনযাপন নিয়ে নিয়মিতই তৈরি হচ্ছে ট্রল।
এরই মধ্যে নতুন করে ঘি ঢেলেছে দলটির একাধিক শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির নানা চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর অভিযোগ। সারজিস আলম, আসিফ মাহমুদ, হাসনাত আব্দুল্লাহদের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্য, অবৈধ তদবির, আর্থিক লেনদেন এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।
দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়ে এনসিপির নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলতে গিয়েও হতাশ হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। টেন্ডারবাজি ছাড়া রাজনৈতিক দল পরিচালনা করা কঠিন, নেতাদের এমন মানসিকতায় ক্ষুব্ধ, আন্দোলনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে থাকা সহকর্মীরা।
ফলে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের দলীয় কর্মসূচিতে বারবার বাধা সৃষ্টি ও হামলার ঘটনা ঘটলেও, দুর্নীতির এসব অভিযোগ সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পাওয়ার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
জনগণের এই পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, দুর্নীতির অভিযোগ কিংবা সামাজিক মাধ্যমের তীব্র সমালোচনার মুখেও শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে কোনো গঠনমূলক আত্মউপলব্ধি বা সংশোধনের বার্তা দেখা যায়নি। বরং সমালোচকদের প্রতি এক ধরনের নির্বিকার, অবজ্ঞাসূচক কিংবা ‘ডোন্ট কেয়ার’ মনোভাবই সাধারণ মানুষকে আরও বেশি দূরে ঠেলে দিয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট ও সাংগঠনিক দুর্বলতা
এর পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক নতুন রাজনৈতিক সিন্ডিকেট ও সমীকরণ নিয়েও তৈরি হয়েছে নানামুখী গুঞ্জন ও অস্বস্তি। ক্যাম্পাসের সাধারণ শিক্ষার্থীরা যে লেজুড়বৃত্তিমুক্ত ও শিক্ষার্থীবান্ধব ছাত্র রাজনীতির স্বপ্ন দেখেছিল, সেখানে নতুন আদলে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর একচেটিয়া আধিপত্য তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে অনেকে।
আন্দোলনের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও কৃতিত্ব বণ্টনের বিষয়ে (অব.) কর্নেল হাসিনুর রহমান মনে করেন, পুরো বিপ্লবের কৃতিত্বকে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক করে ফেলা হয়েছে, যা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের অবদানের প্রতি এক ধরনের অবিচার।
পদযাত্রা ও হামলার ঘটনা
এমনই এক অস্বস্তিকর আর সমালোচনামুখর রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই মাঠের রাজনীতি চাঙ্গা করতে এবং নিজেদের জনসমর্থন যাচাই করতে দেশব্যাপী ‘দেশ গড়তে জুলাই জাগরণ পদযাত্রা’ শুরু করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। আর এই পদযাত্রায় বিভিন্ন জায়গায় তাদের বাধা ও হামলারও শিকার হতে হচ্ছে।
সোমবার (২৭ জুলাই) হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় দলটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথসভা ও সমাবেশ। কিন্তু সেখানে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আর নিজেদের আত্মপর্যালোচনার চেয়ে রাজনৈতিক আক্রমণের সুরই ছিল সবচেয়ে চড়া ও মারমুখী। সমাবেশে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি ও তার শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়েও সরাসরি আক্রমণাত্মক ও কড়া সমালোচনা করে এনসিপির শীর্ষ নেতারা।
নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতা, দুর্নীতির অভিযোগ ও জনবিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে ওঠার পরিবর্তে প্রথাগত রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিয়ে মাঠ গরম করার এই কৌশলকে অনেকেই দেখছে এক বিপজ্জনক রাজনৈতিক জুয়া হিসেবে।
তবে, এনসিপি নেতাদের বক্তব্যের সবচেয়ে আলোচিত, বিস্ফোরক ও উত্তপ্ত অংশ ছিল বিএনপিকে ঘিরে।
এনসিপি নেতাদের এমন সরাসরি ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের পরই মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে যায় হবিগঞ্জের মাঠের পরিস্থিতি। রাজনীতির মঞ্চের সেই উত্তাপ রূপ নেয় সরাসরি মাঠের রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও হিংস্রতায়।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে শহরের টাউন হল প্রাঙ্গণে পথসভা শেষে ফেরার পথে কোর্ট মসজিদ সংলগ্ন এলাকায় এনসিপির গাড়িবহরে অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী মারাত্মকভাবে আহত হয়। দলটির অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে তাদের এই পদযাত্রা ও গাড়িবহরে হামলা চালিয়েছে।
তবে, এনসিপির ওপর এই হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছে হবিগঞ্জ জেলা ছাত্রদল।
জিল্লুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক, ছাত্রদল, হবিগঞ্জ জেলা
অন্যদিকে, হবিগঞ্জ সদর উপজেলা বিএনপির নেতাকর্মীরা, দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিয়ে এনসিপি নেতাদের আপত্তিকর ও উসকানিমূলক বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানায়।
এদিকে, সিলেট এবং কুড়িগ্রামেও হামলার শিকার হয় এনসিপির নেতাকর্মীরা।
জটিল সমীকরণের মুখে এনসিপি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পর, আজ এক চরম কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি।
একদিকে রাজপথে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সাথে তৈরি হওয়া মনস্তাত্ত্বিক ও আদর্শিক দূরত্ব, শহীদ ও আহত পরিবারগুলোর অব্যক্ত বেদনার চাপ, নেতাদের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির বিতর্ক আর অন্যদিকে মাঠের রাজনীতিতে কর্মসূচিতে বাধা, হামলা ও পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সরাসরি সংঘাত, সব মিলিয়ে এক জটিল ও সংকটাপন্ন সমীকরণের মুখে পড়েছে দলটির নীতিনির্ধারকরা। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের যে স্বপ্ন নিয়ে তারা রাজপথে পা রেখেছিল, তা বাস্তবায়নে কঠিনতম পরীক্ষার মুখে দলটি।
ক্ষমতা ও রাজনীতির এই নির্মম খেলায় এনসিপি কি পারবে তাদের ভুলগুলো দ্রুত শুধরে নিয়ে সাধারণ মানুষের সেই হারিয়ে যাওয়া আস্থা আবার ফিরিয়ে আনতে? নাকি জুলাইয়ের সেই কালজয়ী ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ঐক্য কেবল ইতিহাসের পাতাতেই বন্দি হয়ে থাকবে? রাজপথের যে ছাত্র-জনতা একদিন তাদের মাথায় তুলে নিয়েছিল, সেই ছাত্র-জনতার আস্থাহীনতা কাটিয়ে ওঠার ওপরই নির্ভর করছে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অস্তিত্ব। সময়ই বলে দেবে এই ঝোড়ো হাওয়ায় নতুন এই রাজনৈতিক তরী কোন তীরে গিয়ে ভেড়ে।
আরও পড়ুন:








