বুধবার

২৯ জুলাই, ২০২৬ ১৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ইউরোপ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বাদলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

নিউজ ডেস্ক: বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬ ২০:২৩

শেয়ার

ইউরোপ আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি
বাদলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ
ছবি সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হলেও, গাজীপুরে থামছে না নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর ষড়যন্ত্র। একের পর এক ঝটিকা মিছিল। আর এসব মিছিলের নেপথ্যে ইন্ধনদাতা হিসেবে আলোচনায় উঠে আসছে একটি নাম। তিনি ইউরোপ আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এবং জার্মানি শাখার সাবেক সভাপতি শেখ বাদল আহমেদ।

পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে তিনি বেরিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, বহাল তবিয়তে বিদেশে যাতায়াতের পাশাপাশি, বর্তমান অস্থিতিশীলতায় তাঁর সম্ভাব্য ইন্ধন রয়েছে কি না, তা নিয়েও চলছে জোর আলোচনা।

নিষিদ্ধ সংগঠনের ঝটিকা মিছিল নিয়ে আলোচনা

গাজীপুর মহানগরীর ন্যাশনাল পার্ক এলাকা। এখানেই সর্বশেষ মহড়া দেয় নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগ। গত দুই মাসে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ব্যানারে এমন অন্তত ৫ থেকে ৬টি ঝটিকা মিছিল দেখেছে নগরবাসী।

গোয়েন্দা নজরদারি এড়িয়ে এমন প্রকাশ্য তৎপরতায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ। তাঁদের দাবি, যারা অর্থ দিয়ে এই অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করছে, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।

স্থানীয়দের অভিযোগ ও আলোচনায় বারবারই উঠে আসছে বাদলের নাম। গাজীপুরের টঙ্গীর আলোচিত জাবান হোটেলের মালিক ৫৫ বছর বয়সী শেখ বাদল আহমেদের বিরুদ্ধে রয়েছে নানামুখী অভিযোগ।

মানবপাচার ও প্রতারণার অভিযোগ

নিজের এই হোটেল থেকে নারী কর্মীদের বিদেশে পাঠানোর নামে মানবপাচারের অভিযোগ রয়েছে বাদলের বিরুদ্ধে। এছাড়া, গত ৫ আগস্টের পর হোটেলে প্রশাসনের যৌথ বাহিনীর অভিযানের সময় এক কর্মচারী দোতলা থেকে দেয়াল টপকে পালাতে গিয়ে বিদ্যুতের তারে জড়িয়ে মারা যান। অভিযোগ রয়েছে, মালিকপক্ষের অবহেলায় পরদিন দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেই মরদেহ সরানো বা হাসপাতালে নেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এ ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে দুটি মামলাও রয়েছে।

প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশে পাঠানোর নামে নিরীহ শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে শেখ বাদলের বিরুদ্ধে। ভিটেমাটি বিক্রি করে নিঃস্ব হওয়া টঙ্গীর নির্মাণশ্রমিক জুয়েলের দাবি, বছরের পর বছর ঘুরিয়েও টাকা ফেরত দেননি বাদল।

শুধু প্রতারণাই নয়, কর্মীদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করালেও ন্যায্য পাওনা পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। পাওনা টাকা চাইতে গেলে উল্টো শারীরিক নির্যাতন ও হুমকির শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

সম্পদ, কর ও মামলার অভিযোগ

বিগত স্বৈরাচারী সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন এই বাদল। অভিযোগ রয়েছে, সজীব ওয়াজেদ জয়ের সঙ্গে যৌথ ব্যবসার আড়ালে অর্থ পাচারের মূল সহযোগী ছিলেন তিনি। এমনকি আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের অর্থসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগেও তাঁর নাম এসেছে।

দুর্নীতির মাধ্যমে কী পরিমাণ সম্পদ তিনি গড়েছেন, তার চিত্র রীতিমতো চমকে ওঠার মতো। এনবিআর বলছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এক টাকাও কর দেননি তিনি। অথচ এই সময়ে বনে গেছেন ২ হাজার কোটি টাকারও বেশি সম্পদের মালিক। হাতিরঝিলে নির্মাণাধীন পাঁচতারকা হোটেল, গুলশানে ৯ হাজার স্কয়ার ফিটের বিলাসবহুল ফ্ল্যাট থেকে শুরু করে উত্তরা, খুলনা ও গোপালগঞ্জে রয়েছে তাঁর একাধিক রিসোর্ট ও বাড়ি। গ্যারেজে শোভা পাচ্ছে শত কোটি টাকা মূল্যের বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ, হ্যারিয়ার ও ভি-৮–এর মতো বিলাসবহুল গাড়ি। সংগ্রহে আছে কোটি টাকার বেশি মূল্যের অন্তত ৭০টি বহুমূল্য ঘড়ি।

এসব গুরুতর অপরাধের কারণে টঙ্গী পূর্ব থানার ১২০৯ নম্বর মামলার ৫৪ ধারায় তাঁকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাঁকে পাঠানো হয় কারাগারেও। তাঁর বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে একাধিক গুরুতর মামলা বিচারাধীন। কিন্তু এত কিছুর পরও আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে খুব সহজেই বেরিয়ে আসেন তিনি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হত্যা মামলাসহ দায়ের করা বেশ কয়েকটি মামলায় স্বৈরাচার শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আসামি হিসেবে নাম রয়েছে এই বাদলেরও।

হুমকির অভিযোগ ও বিদেশ যাতায়াত

এদিকে, এসব মামলার আসামি হওয়ার পরও তাঁকে গ্রেপ্তার না করার প্রতিবাদ জানানোয় স্থানীয় এনসিপি নেতা মঈন আহমেদকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বাদলের বিরুদ্ধে।

মো. মঈন আহমেদ, সদস্যসচিব, টঙ্গী পূর্ব থানা, এনসিপি দাবি করেন, জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ন্যায্য আন্দোলন দমন ও হত্যাকাণ্ডে বিপুল অর্থ জোগান দিয়েছিলেন এই বাদল।

জানা যায়, জার্মান নাগরিক জান্নাতুল শেখকে বিয়ের সুবাদে জার্মানির দ্বৈত নাগরিকত্ব পান বাদল। অভিযোগ রয়েছে, এই পরিচয়ের আড়ালেই রাতারাতি খোলস পাল্টে ফেলেন তিনি। বিদেশি স্ত্রীর প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে সুবিধা নেওয়ার পাশাপাশি, একাধিক হত্যা মামলার আসামি হয়েও তিনি দিব্যি ঘোরাফেরা করছেন। নিয়মিত যাতায়াত করছেন বিদেশেও।

বক্তব্য মেলেনি, জনমনে প্রশ্ন

এদিকে, এসব অভিযোগের বিষয়ে শেখ বাদল আহমেদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

হত্যা মামলা, অবৈধ সম্পদের পাহাড় আর নাশকতায় অর্থায়নের মতো গুরুতর সব অভিযোগ থাকার পরও একজন আলোচিত ব্যক্তি কীভাবে ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন, তা নিয়েই এখন জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সাধারণ মানুষের দাবি, আইনের ফাঁকফোকর বন্ধ করে দোষীদের দ্রুত বিচারের মুখোমুখি করার পাশাপাশি, গাজীপুরের অস্থিতিশীলতার নেপথ্য কারিগরদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনা হোক।



banner close
banner close