বুধবার

২৯ জুলাই, ২০২৬ ১৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

ইলিয়াস আলী গুমে নতুন মোড়, হেফাজতে সাবেক বিমান কর্মকর্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ জুলাই, ২০২৬ ১২:১১

শেয়ার

ইলিয়াস আলী গুমে নতুন মোড়, হেফাজতে সাবেক বিমান কর্মকর্তা
ছবি সংগৃহীত

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ১৪ বছর পর মামলার তদন্তে নতুন অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। এ ঘটনায় সম্পৃক্ততার অভিযোগে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার মো. সাইফুর রহমানকে হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

সশস্ত্র বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার সাইফুর রহমানকে আটক করে বিমান বাহিনীর হেফাজতে নেওয়া হয়। তবে আন্তবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক কর্মকর্তা এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো বিস্তারিত মন্তব্য না করে পরে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন।

২০১২ সালে ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার সময় সাইফুর রহমান স্কোয়াড্রন লিডার পদে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি উইং কমান্ডার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। অবসরের পর একটি বেসরকারি বিমান সংস্থায় পাইলট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদের জামাতা।

গত ২১ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সেনাবাহিনীর ওয়ারেন্ট অফিসার ইমরুল কায়েসের সাক্ষ্যে ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় সাইফুর রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। একই সাক্ষ্যে র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়। ইমরুল শতাধিক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিচ্ছিলেন, যেখানে প্রধান আসামি জিয়াউল আহসান।

সাক্ষ্যে ইমরুল কায়েস দাবি করেন, জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে সাদা পোশাকে র‌্যাবের একটি দল মহাখালী ওভারব্রিজ এলাকায় ইলিয়াস আলীকে আটকের উদ্দেশ্যে অবস্থান নিয়েছিল এবং সেই দলে স্কোয়াড্রন লিডার সাইফুর রহমানও ছিলেন। তবে সেদিন সেখানে তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বনানী এলাকা থেকে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালককে তুলে নেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছেন, ডিজিটাল প্রমাণ বিশ্লেষণে তারা প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছেন, ঘটনাটি র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগ পরিচালনা করেছিল। সংশ্লিষ্টদের দায় আদালতে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হবে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত ডিজিএফআইয়ের সম্পৃক্ততার কোনো ডিজিটাল প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। সাইফুর রহমানকে রিমান্ডে নেওয়া হলে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে রাজধানীর হোটেল শেরাটন থেকে বাসায় ফেরার পথে বনানীর ২ নম্বর সড়ক এলাকা থেকে ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক নিখোঁজ হন। অভিযোগ ওঠে, তাদের অপহরণ করা হয়েছে। তবে সে সময় কোনো সরকারি বাহিনী তাকে আটক করার বিষয়টি স্বীকার করেনি এবং তৎকালীন সরকারও বিষয়টি নিয়ে কার্যকর তদন্ত করেনি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও সাবেক সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর লুনা গুম কমিশনে অভিযোগ করেন। পরে বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়।

মঙ্গলবার রাতে তাহসিনা রুশদীর লুনা বলেন, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পর রহস্য উদঘাটন ও ন্যায়বিচারের পথ তৈরি হয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে জড়িতদের পরিচয় সামনে আসছে এবং পর্যায়ক্রমে সবাই আইনের আওতায় আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

এদিকে ২০২২ সালে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল, ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার কয়েকজন কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য তদন্তে উঠে আসে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ভুয়া পরিচয়ে কেনা সিটিসেলের আটটি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সুপরিকল্পিতভাবে অপহরণ অভিযান পরিচালিত হয়েছিল। তদন্ত প্রতিবেদনটি র‌্যাব সদর দপ্তর, প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং সামরিক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষের কাছেও পাঠানো হয়েছিল।

ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সে সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে তার স্ত্রী তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করে স্বামীর সন্ধান চেয়েছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনার আশ্বাস দিলেও ইলিয়াস আলীর ভাগ্য সম্পর্কে আজও নিশ্চিত কোনো তথ্য প্রকাশ্যে আসেনি।



banner close
banner close