স্বামীর সামনে স্ত্রীকে ধর্ষণ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতার মৃত্যুদণ্ড এমসি কলেজের সেই ঘটনা কতটা ন্যায়বিচার পেলেন তরুণী ধর্ষণ মামলার রায় এমসি কলেজের ধর্ষণ মামলায় অভিযুক্ত একজনের মৃত্যুদণ্ড তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
শিক্ষার আলোয় আলোকিত হওয়ার কথা ছিল যে হাত সেই হাতেই একদিন নেমে এসেছিল অন্ধকারের কালো ছায়া। সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাস যেখানে স্বপ্ন বাস্তবতায় রূপ নেয় হাজারো তরুণ-তরুণীর সেখানেই কোনো এক নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় ভেঙে চুরমার হয়েছিল এক তরুণীর জীবন। ছারখার হয়েছিল তার নিরাপত্তা মর্যাদা আর বিশ্বাস। আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে সিলেটের এমসি কলেজে ঘটে যাওয়া সেই ২০ বছর বয়সী নববধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের লোমহর্ষক ঘটনা। দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে অবশেষে এলো বহুল আলোচিত এই মামলার রায়।
২০২০ সালে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে স্বামীকে আটকে রেখে তার সামনেই স্ত্রীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় অভিযুক্ত আটজনের মধ্যে একজনের মৃত্যুদণ্ড তিনজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং চারজনকে খালাস দিয়েছে আদালত। মঙ্গলবার সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এই রায় ঘোষণা করেন।
মামলার প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এছাড়া শাহ মাহবুবুর রহমান ওরফে রনি তারেকুল ইসলাম ওরফে তারেক এবং অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অন্য চার আসামি আইনুদ্দিন ওরফে আইনুল মিসবাউল ইসলাম ওরফে রাজন রবিউল এবং মাহফুজুর রহমানকে আদালত বেকসুর খালাস দিয়েছে। অভিযুক্তদের প্রত্যেকেই নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের টিলাগড়কেন্দ্রিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
অভিযোগ উঠেছে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার এই মামলায় আসামিদের বাঁচাতে প্রমাণ নস্যাৎ থেকে শুরু করে নানামুখী অপচেষ্টা এবং বিভিন্ন ধরনের বেআইনী হস্তক্ষেপ করেছিল। পাশাপাশি প্রসিকিউশনও সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেনি বলে আদালতে অভিযোগ করেন বাদীপক্ষের আইনজীবী।
আদালত সূত্র জানায় ২০২৫ সালের মে মাসে মামলাটি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তরের পর মোট ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দেন। এর মধ্যে ছিলেন নির্যাতনের শিকার গৃহবধূ ও তার স্বামী আসামিদের জবানবন্দি গ্রহণকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এমসি কলেজের এক অধ্যাপক এবং ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক। যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের তারিখ নির্ধারণ করেন বিচারক। আট আসামির মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের মিল পাওয়া গেছে বলেও জানান বিচারক। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা দেন বিচারক স্বপন কুমার সরকার।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সিলেটের ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এমসি কলেজে ঘটে ধর্ষণের ওই ন্যক্কারজনক ঘটনা। দিনের আলো ফুরোলে এই ক্যাম্পাসে নেমে আসে এক নিস্তব্ধতা থমথমে পরিবেশ আর ভুতুড়ে নীরবতা। সেই নীরবতার সুযোগেই ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে সংঘটিত হয় এক লোমহর্ষক ঘটনা যা শিউরে তোলে পুরো দেশকে।
ওইদিন সন্ধ্যায় ছাত্রাবাস এলাকায় ঘুরতে যান এক দম্পতি। এজাহার অনুযায়ী ২৫ সেপ্টেম্বর বিকেলে স্বামীকে নিয়ে শাহপরান মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন নির্যাতনের শিকার তরুণী। ফেরার পথে তারা নগরের টিলাগড় এলাকার এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামান। স্ত্রীকে প্রাইভেটকারে রেখে স্বামী পাশের একটি দোকানে যান। সেই সময় কয়েকজন তরুণ প্রাইভেটকারটি ঘিরে ফেলে এবং দম্পতিকে জোরপূর্বক এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের ভেতরে নিয়ে যায়। সেখানে স্বামীর সামনেই গাড়ির ভেতরে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয় তরুণীকে। পরে তাদের মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয় এবং গাড়িটি আটকে রাখে।
ঘটনার রাতেই নির্যাতিত তরুণীর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় এমসি কলেজ ছাত্রলীগের ছয়জন নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ করে আরও দুইজনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। একই ঘটনায় প্রাইভেটকার আটকে রেখে চাঁদাবাজির অভিযোগে আরও একটি মামলা হয়। পরবর্তীতে দুটি মামলাই একসঙ্গে পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়।
ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে পুলিশ ও র্যাবের যৌথ অভিযানে আটজনকেই গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তারা আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। ডিএনএ পরীক্ষাতেও আট আসামির মধ্যে ছয়জনের সঙ্গে ধর্ষণের আলামতের মিল পাওয়া যায়।
২০২১ সালের ৩ ডিসেম্বর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। এর আগে ২০২১ সালের ১০ জানুয়ারি আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচারকার্য শুরু করেন। দীর্ঘ শুনানি ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক শেষে অবশেষে ঘোষণা করা হলো এই বহুল আলোচিত মামলার রায়।
রায় এসেছে শাস্তি হয়েছে কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে এই বিচার কি সত্যিই মুছে দিতে পেরেছে সেই রাতের ভয়াবহতা। যে ক্ষত তৈরি হয়েছিল এক তরুণীর জীবনে তা কি কোনো রায়েই পূরণ হওয়ার।
আরও পড়ুন:








