শনিবার

৪ জুলাই, ২০২৬ ২০ আষাঢ়, ১৪৩৩

স্থানীয় সরকারে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ জুলাই, ২০২৬ ১০:২৩

শেয়ার

স্থানীয় সরকারে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রশ্ন
ছবি সংগৃহীত

নির্বাচনী ইশতেহারে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি দিলেও ক্ষমতায় আসার পর এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বিএনপি সরকার। এমনকি তাদের প্রথম বাজেটেও সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন দেখা যায়নি। ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া অন্য সব স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে গত আড়াই বছর ধরে কোনো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। এতে নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচিত হওয়া সরকার এখনো স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ দেখায়নি।

নির্বাচন কমিশন আগামী অক্টোবরে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর আগে, ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদ ভেঙে দেয়। বর্তমানে এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তারা সমালোচনার মুখে পড়েছেন।

অন্যদিকে, ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের পর সরকার গঠনের তিন সপ্তাহের মধ্যেই উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন শুরু হয়েছিল। একইভাবে, ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনের এক মাসের মধ্যে উপজেলা নির্বাচন এবং পরে পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

এই অচলাবস্থার ব্যাখ্যা দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক সাদিক হাসান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, তার ধারণা সরকার সময়ক্ষেপণ করছে। ২০১৫ সালের যে আইনে দলীয় প্রতীকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, সেটি বাতিলের চেষ্টা চলছে। যদিও সংসদের বর্তমান অধিবেশনে এ-সংক্রান্ত কোনো বিল উত্থাপন করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, দেশের অন্যতম একটি বড় রাজনৈতিক দলকে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে কি না, তা নিয়ে সংসদ বিভক্ত এবং এ বিষয়ে এখনো কোনো ঐকমত্য তৈরি হয়নি।

নির্বাচনী ইশতেহারে পদ শূন্য হওয়া কিংবা আদালতের আদেশ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ না করার প্রতিশ্রুতি থাকলেও বিএনপি সরকার সে অবস্থান থেকে সরে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কোনো জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত না করার প্রতিশ্রুতি টেকনিক্যালি বহাল থাকলেও নতুন সরকার ইউনূস সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রশাসকদের পদ্ধতিগতভাবে সরিয়ে সিটি করপোরেশনগুলোতে নিজেদের দলীয় অনুসারীদের নিয়োগ দিয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বিশেষায়িত জেলা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নেতৃত্বও বিএনপি নেতাদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

এ পরিবর্তনের বিষয়টি স্পষ্ট হয় ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের ১০ দিন পর। ঢাকা-১৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টনকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। একইভাবে, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক মো. আবদুস সালাম ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব পান। পরে তিনি টাইমসকে বলেন, আগামী মেয়র নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই তিনি এই দায়িত্ব ব্যবহার করছেন।

এরপর গত ১৫ মার্চ স্থানীয় সরকার বিভাগ ৪২টি জেলা পরিষদে দলীয় নেতাদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেয়। দুই সপ্তাহ পর আরও ১৪টি জেলা পরিষদে একই ধরনের নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে ৪ জুন বাকি তিনটি জেলা পরিষদের দায়িত্বও রাজনৈতিকভাবে মনোনীত ব্যক্তিদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সার্বিক বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মুস্তাফা দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

অধ্যাপক সাদিক হাসানের মতে, নির্বাচনে বাড়তি সুবিধা পেতেই বিএনপি স্থানীয় পর্যায়ে নিজেদের লোকজনকে বসিয়েছে। তিনি বলেন, এ ধরনের দলীয় নিয়ন্ত্রণ আগামী নির্বাচনের নিরপেক্ষতার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হতে পারে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশে সুষ্ঠু স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিশ্চিত করা ঐতিহাসিকভাবেই কঠিন।

নির্বাচনী ইশতেহারে একটি স্বাধীন সংবিধিবদ্ধ কমিশনের মাধ্যমে উন্নয়ন বাজেটের বড় অংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ দিয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য দূর করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সরকারের প্রথম বাজেটে এ কমিশন গঠনের কোনো উদ্যোগ বা ব্যাখ্যা ছিল না।

মামুন আল মুস্তাফা বলেন, কমিশন গঠনে সময় লাগলেও এ বিষয়ে সরকারের একটি আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, নিজস্ব রাজস্ব আয় না থাকলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি কেন্দ্রীয় তহবিলের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছামতো অর্থ বরাদ্দ দিতে পারে।

অন্যদিকে, অধ্যাপক সাদিক হাসান মনে করেন, এই কমিশন গঠন সরকারের কাছে এখন কম অগ্রাধিকার পাচ্ছে। ফলে আগামী বছরের আগে এ বিষয়ে কোনো নীতিগত বিবৃতি নাও আসতে পারে।

এদিকে সরকার প্রতিটি সংসদ সদস্যকে নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাঁচ বছরে ৫০ কোটি টাকা, অর্থাৎ বছরে ১০ কোটি টাকা করে বরাদ্দ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব করেছে। এর আওতায় সংসদ সদস্যরা নিজস্ব বিবেচনায় স্থানীয় সড়ক, সেতু, কালভার্ট ও হাটবাজার উন্নয়নে তহবিল বরাদ্দ দিতে পারবেন।

এ ছাড়া, সোমবার (২৯ জুন) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদে জানান, প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকার জন্য, সিটি করপোরেশন এলাকা বাদে, তার নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা মঞ্জুর করেছেন।

সমালোচকদের মতে, এই পদক্ষেপ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীনভাবে ক্ষমতায়নের ইশতেহারি প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সাদিক হাসান টাইমসকে বলেন, এ সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মূল দর্শন এবং বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে। তিনি বলেন, স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত রাখা উচিত। একজন সংসদ সদস্যকে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিলে সেই অর্থ কেবল তার রাজনৈতিক অনুসারীদের কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তার ভাষায়, একজন সংসদ সদস্যের প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব আইন প্রণয়ন করা, উন্নয়ন তহবিল বিতরণ করা নয়।

প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের প্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে এসেছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আপাতদৃষ্টিতে তেমনই মনে হচ্ছে। অন্তত সরকারের উচিত এ বিষয়ে জনগণকে একটি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া।

এদিকে উপজেলা পরিষদে সংসদ সদস্যদের জন্য আধুনিক পরিদর্শন কক্ষ নির্মাণের সরকারি সিদ্ধান্তও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে স্থানীয় সরকারের ওপর সংসদীয় আধিপত্য আরও শক্তিশালী হবে।

সাদিক হাসান বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে সংসদ সদস্যদের কোনো সম্পৃক্ততা থাকা উচিত নয়। উপজেলা পরিষদে তাদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়া হলে রাজনৈতিক কোটারি তৈরি হবে এবং স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করবে, যা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে ব্যাহত করবে।

এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে মীর শাহে আলম সংসদে এ নীতির পক্ষে বক্তব্য দিয়ে বলেন, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের একটি সমস্যা সমাধান হবে। সংসদ সদস্যরা নির্বাচনী এলাকায় গেলে বসার জন্য একটি উপযুক্ত স্থান পাবেন।

তবে সমালোচকদের মতে, এই কাঠামোগত পরিবর্তন বিকেন্দ্রীকরণের পথ থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দেয় এবং কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে সরাসরি স্থানীয় প্রশাসনের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।

প্রশাসক নিয়োগ না করার ইশতেহারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির স্থানীয় সরকারবিষয়ক সম্পাদক সোহরাব উদ্দিন বলেন, প্রশাসন যত দ্রুত সম্ভব কাজ করছে। তিনি টাইমসকে বলেন, সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র চার মাস হয়েছে। এটিকে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে এসব প্রতিশ্রুতি পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন তহবিল নিয়ে সমালোচনার জবাবে তিনি বলেন, সংসদ সদস্যদের জন্য বরাদ্দ এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। তার মতে, এর ফলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।



banner close
banner close