নিষিদ্ধ ঘোষণার পর প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়লেও দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে পরিচয় গোপন করে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছেন ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) সংগঠনটির একটি অংশ ছদ্মবেশে সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখা, বিকল্প প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়া এবং সুযোগ বুঝে কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছে বলে বিভিন্ন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রকাশ্য ও গোপন—এই দুই ধাপে কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটির সদস্যরা। ক্যাম্পাসে অবস্থানরত অংশটি তথ্য সংগ্রহ, যোগাযোগ রক্ষা এবং সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করছে। অন্যদিকে ক্যাম্পাসের বাইরে অবস্থানকারী অংশটি বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে। উভয় পক্ষের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখা হচ্ছে বলেও একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, আজিমপুর, চানখাঁরপুল, ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, ফার্মগেট ও মিরপুরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল, পোস্টারিং ও অন্যান্য সাংগঠনিক তৎপরতার চেষ্টা করছেন।
গত ২ মে সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার এ এফ রহমান হল ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফারহান তানভীর নাসিফের নেতৃত্বে একটি ঝটিকা মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। পরে পুলিশ নাসিফ ও তার সঙ্গে থাকা মাইক্রোবাসচালক রুবেল মিয়াকে গ্রেপ্তার করে। ১১ মে আদালত তাদের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
এরপর ২০ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ছাত্রলীগের ব্যানার নিয়ে অবস্থান নেন শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল ছাত্রলীগের প্রশিক্ষণ সম্পাদক টিএসআই জাওয়াদ এবং সূর্য সেন হল ছাত্রলীগের গ্রন্থনা ও প্রকাশনা সম্পাদক ওমর ফারুক।
১ জুন ডাকসুর সামনে ছয় দফা দাবিতে মৌন মানববন্ধন কর্মসূচিতে সংগঠনটির কয়েকজন নেতাকর্মী অংশ নেন। এতে উপস্থিত ছিলেন শেখ মোহাম্মদ নাঈম, শিবলী সাদিক, রাজিব জামান, মুহিবুল ইসলাম বিজয়, ইমরান হোসাইন ও সাব্বির হোসাইন খোকা।
এছাড়া ৫ জুন ভোরে শেখ মোহাম্মদ নাঈমের নেতৃত্বে কয়েকজন কর্মী শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের মূল ফটকে আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে একটি ব্যানার টাঙান বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডাকসু নির্বাচন ঘিরে সক্রিয়তা
অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক ডাকসু নির্বাচনেও সংগঠনটির সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন পদে অংশ নেন। তাদের মধ্যে সূর্য সেন হল ছাত্রলীগের উপ-দপ্তর সম্পাদক আয়ান আব্দুল্লাহ মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে এবং উপ-শিক্ষা ও পাঠচক্র সম্পাদক মোহাম্মদ রিয়াজ মাতাব্বর ক্রীড়া সম্পাদক পদে নির্বাচন করেন।
এছাড়া পরিবহন সম্পাদক পদে রাজিন হোসেন, কার্যনির্বাহী সদস্য পদে আবিদ আব্দুল্লাহ, সহসভাপতি (ভিপি) পদে শামীম হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে আরাফাত চৌধুরী নির্বাচন করেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বিত প্রচারণা পরিচালিত হয় এবং বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থায়নের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নতুন প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাবেক ছাত্রলীগের অনেক কর্মী রাজনৈতিক পরিচয় গোপন রেখে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্ল্যাটফর্ম ও অরাজনৈতিক ব্যানারে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন।
অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, 'নেক্সট জেন বাংলাদেশ' নামে একটি সামাজিক সংগঠন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অন্যতম উদ্যোক্তা আবিদ আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য সেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং ভবিষ্যতে দেশব্যাপী কার্যক্রম সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সংগঠনটির জন্য অনুদান সংগ্রহও শুরু হয়েছে।
অনুসন্ধান বলছে, সূর্য সেন হলকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির কিছু কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর সঙ্গে আয়ান আব্দুল্লাহ, রিয়াজ মাতাব্বর, ওমর ফারুক, মুন্সি রাকিব হোসেন, আরাফাত চৌধুরী ও ফাহিম শাহরিয়ারের নাম উঠে এসেছে। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাজহারুল কবির শয়নের অনুসারী বলে দাবি করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সক্রিয়তা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কার্যক্রম বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সংগঠনটির একটি অংশ ভুয়া আইডি ব্যবহার করে অনলাইনে সক্রিয় রয়েছে। বিভিন্ন সময় হুমকি, বুলিং এবং সমন্বিত প্রচারণার অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞের মত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, আইনি প্রক্রিয়ায় আওয়ামী লীগের বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা যত বাড়বে, সংগঠনটির পুনরায় সক্রিয় হওয়ার সুযোগ তত কমবে।
তার ভাষ্য, ছাত্রলীগের বর্তমান পরিস্থিতিকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় বলা যাবে না। বরং এটি একটি রূপান্তরকাল অতিক্রম করছে। অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলে সংগঠনটির একটি অংশ আবার প্রকাশ্যে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
প্রশাসনের বক্তব্য
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ইসরাফিল রতন বলেন, নিষিদ্ধ যেকোনো সংগঠনের বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। এরপরও কেউ প্রশাসনের নজর এড়িয়ে অপতৎপরতা চালানোর চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিষিদ্ধ সংগঠনের কিছু সদস্য কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে। তাদের শনাক্ত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরও পড়ুন:








