রাজনীতি হলো জনগণের সেবা, রাজনীতি হলো জনগণের কণ্ঠস্বর। তবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রায়ই সুবিধাবাদ, দলবদল এবং ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থান দেখলে মনে হয় রাজনীতি আর মানুষের সেবা নয়। রাজনীতি এখন টাকা কামানোর এক আলাদিনের চেরাগ, যার মাধ্যমে নিঃস্ব অসহায় মিসকিনেরও ভাগ্যের তালা খুলে যায়। যার কারণে মানুষ ফ্যাসিস্ট সরকারকেও মমতাময়ী মা বলতে দ্বিধা করে না।
সম্প্রতি রাশেদ খানের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় শেখ হাসিনাকে মমতাময়ী মা বলে সম্বোধন করেছেন এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটি নিয়ে বিভিন্ন মহলে সমালোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়।
সেসময়ে রাশেদের পাশে থেকে একই ধরনের বক্তব্য দেন নুরুল হক নুর।
একদিকে আওয়ামী আমলে ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে রাশেদ খানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, অন্যদিকে হাসিনা পতনের ঠিক পরেই শহীদ জিয়ার আদর্শে নিজেকে আবৃত করে ফেলেন রাশেদ খান। এ কারণে সাধারণ মানুষের অনেকেই তাকে পল্টিবাজ রাশেদ সম্বোধন করে থাকেন।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি থেকে নিজের আসন পাকাপোক্ত করতে রাশেদ খান পূর্বে যেমন শেখ হাসিনাকে মমতাময়ী মা বলে সম্বোধন করেছেন, ঠিক একইভাবে বিএনপিতে যোগ দেয়ার পরে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য তারেক রহমানকে তোষামোদ করতে এক পাও পিছপা হননি। এমন সমালোচনা রয়েছে।
রাশেদ খানের বিএনপিতে যোগদান নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা বিতর্ক রয়েছে। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তেই রাশেদ খান বিএনপিতে যোগ দেন। গণ অধিকার পরিষদ থেকে মনোনয়ন বা আসন নিশ্চিত না হওয়ায় তিনি বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দলে যোগ দেন বলে রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করে। একইসঙ্গে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বিএনপির মধ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করতে বিভিন্ন সময় রাশেদ খান জামায়াত, এনসিপি ১১ দলীয় জোটের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে বেফাঁস মন্তব্য করে আসছেন। সম্প্রতি জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে তার একটি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উঠে আসে, যেখানে তিনি জামায়াতে ইসলামীকে জালেম বলে উল্লেখ করেন।
এছাড়াও এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বিরুদ্ধেও এক বক্তব্যে তাকে দুর্নীতির অভিযোগ আনতে দেখা যায়।
অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের দ্বিতীয় বিয়ে নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে বিভিন্ন নেতিবাচক বক্তব্য দিতে দেখা যায়।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত আরেকটি ভিডিওতে এনসিপির নেতা নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীকে উদ্দেশ করে অকাট্য ভাষায় গালিগালাজ করতে দেখা যায় রাশেদ খানকে, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়।
অনেকে মনে করছেন রাশেদ খান ফ্যাসিস্টকে পুনর্বাসন করার পুরো রোডম্যাপ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে নিয়ে এমন বিস্ফোরক বক্তব্য ফ্যাসিবাদবিরোধীদের মাঝে ভাঙন সৃষ্টি করছে এবং ফ্যাসিবাদকে শক্তিশালী করছে বলে দাবি অনেকের।
এদিকে রাশেদ খানের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অন্যায়ভাবে টাকা আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলেও অনেকে অভিযোগ করেছে।
একইভাবে সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিব হলের নাম পরিবর্তনের প্রসঙ্গে শিবির নেতাদের সমালোচনা করে নেটিজেনদের তোপের মুখে পড়েছেন রাশেদ খান। ঢাবিতে শেখ মুজিবের নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তন করে ওসমান হাদির নামে না করায় সিনেট থেকে ওয়াকআউট করেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম ও জিএস এস এম ফরহাদ। বিষয়টির সমালোচনা করে রাশেদ খান ফেসবুকে লেখেন শেখ মুজিবুর রহমানকে ফ্যাসিবাদের আইকন জানার পরেও কেন তার নামে স্লোগান দেয়া হলো? আর এখন কেন তার নামে থাকা হলের নাম পরিবর্তনের জন্য শিবির নেতারা আন্দোলন শুরু করেছেন কেন? শেখ মুজিবুর রহমান কি গণ-অভ্যুত্থানের সময় জীবিত হয়ে ফিরে এসে সাদিক কায়েম বা ফরহাদের গালে থাপ্পড় মেরেছিলেন?
নূরুল হক নুর, রাশেদ খান ও আম জনতার তারেক রহমান মিলে ২০২১ সালে গণ অধিকার পরিষদ গঠন করেন। এসময় বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অভিযোগও ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। এরপর নানা কারণবশত গণ অধিকার থেকে বের হয়ে যায় অনেকেই।
যখন যেই সরকার ক্ষমতায় থাকে রাশেদ খানের মতো নেতারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদেরই তাঁবেদারি করে বলেই সমালোচনা রয়েছে। এমনকি এই ধরনের নেতাদের কোনো রাজনৈতিক আদর্শ নেই বলেই নিজের স্বার্থে জুলাইয়ের পক্ষের শক্তিদের চরিত্র হনন করছেন বলে মত সংশ্লিষ্টদের। দেশের জন্য ও ফ্যাসিবাদী ঐক্য বজায় রাখার স্বার্থে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বক্তব্য থেকে রাশেদ খানকে বিরত থাকার আহ্বান সচেতন মহলের।
আরও পড়ুন:








