রবিবার

২৮ জুন, ২০২৬ ১৪ আষাঢ়, ১৪৩৩

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে এমপি জিএম সিরাজের বিতর্কিত মন্তব্য

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮ জুন, ২০২৬ ১৮:৩৯

শেয়ার

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে এমপি জিএম সিরাজের বিতর্কিত মন্তব্য
ছবি সংগৃহীত

ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্বামী-স্ত্রীর সাথে তুলনা করে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন বগুড়া-৫ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে দেওয়া তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় ও প্রথম বাজেট অধিবেশনের ১২তম দিনে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এই উপমা ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, সংসার জীবনে মতের অমিল হলে আইনি প্রক্রিয়ায় স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ বা ডিভোর্স হতে পারে। তবে মানচিত্রের কারণে প্রতিবেশী রাষ্ট্রকে অস্বীকার করা বা তাদের সাথে বিচ্ছেদ সম্ভব নয়। তার এই বক্তব্যের পরপরই নিজ দল বিএনপিসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিএনপি ভারতের বিভিন্ন নীতির সমালোচনা করে আসলেও সিরাজের এমন মন্তব্যকে অনেকে ব্যক্তিগত স্বার্থ রক্ষার কৌশল হিসেবে দেখছেন।

সংসদে দেওয়া এই বক্তব্যে সিরাজ বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীর একটি বার্তার কথা স্মরণ করেন। হাইকমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী ভারত ও বাংলাদেশ একই আকাশ ও বাতাসের নিচে অবস্থানের বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন। তবে সিরাজের এমন মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। এছাড়া সাবেক সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদও সংসদে দাঁড়িয়ে এই বক্তব্যের বিরোধিতা করে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে, যা কোনোভাবেই দাসত্বমূলক হওয়া উচিত নয়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সিরাজের এই অবস্থানকে আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেনের নীতির সাথে তুলনা করেছেন।

এমপি সিরাজের এমন মন্তব্যের নেপথ্যে তার বিরুদ্ধে ওঠা বিপুল অংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগকে দায়ী করছেন অনেকে। তথ্য অনুযায়ী, তার ও তার স্ত্রীর নামে প্রায় সাড়ে ৫শ কোটি টাকার ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুসারে, সিরাজের নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে ১০৯ কোটি টাকা এবং তার স্ত্রী শাহনাজ সিরাজের প্রতিষ্ঠানের নামে ৫১২ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ রয়েছে। নির্বাচনি হলফনামায় এসব তথ্য গোপনের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এছাড়া ভুয়া এলসির মাধ্যমে বিদেশে অর্থপাচার এবং ভুয়া ভ্যাট চালানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রায় ৪০ কোটি টাকা কর ফাঁকির বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে নথিপত্র রয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এসব আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে এবং ভারতের লবিস্টদের নজর কাড়তে তিনি এমন তোষামোদমূলক মন্তব্য করেছেন।

সিরাজের রাজনৈতিক অতীত নিয়েও দলের ভেতরে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের সময় তিনি সংস্কারপন্থী হিসেবে পরিচিতি পান এবং জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। সে সময় তিনি বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভূঁইয়ার সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে ছিলেন এবং দলীয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের দাবিতে বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। বর্তমানে বগুড়া জেলা বিএনপির আহ্বায়ক পদ বাগিয়ে নেওয়া এবং এলাকার বাসিন্দা না হয়েও বারবার মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে স্থানীয় তৃণমূল নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। স্থানীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে হটাও সিরাজ, বাঁচাও দল স্লোগান দিয়ে কর্মীরা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদও জানিয়েছেন।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা, ভিসা বন্ধ এবং ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় আসা হুমকির প্রেক্ষাপটে সিরাজের এমন বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কর্নেল (অব.) হাসিনুর রহমান বাংলা এডিশনের আতিফ রাসেল জানান, নিজের অবৈধ সম্পদ রক্ষা এবং রাজনৈতিক সুরক্ষার জন্যই সিরাজ এই পথ বেছে নিয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয়। বর্তমানে এই সংসদ সদস্যের পদত্যাগ দাবি করার পাশাপাশি তার বিষয়ে দলীয় হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরা।



banner close
banner close