বাংলাদেশের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডে ভারতের সরাসরি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছেন। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা হারানোর প্রায় এক মাস পর গত মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলায় আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এ বক্তব্য দেন।
সরাসরি কারো নাম উল্লেখ না করে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, বাংলাদেশ থেকে একজন বড় হত্যাকারী মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসলে তার এসটিএফ তাকে গ্রেপ্তার করে। এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে তাকে ফোন করে জানিয়েছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি আরো বলেন, কাকে দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে এবং কার কার নাম এতে জড়িত, তা তার জানা আছে। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় তিনি নাম প্রকাশ করবেন না বলে জানান।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, মমতার এ বক্তব্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক তরুণ রাজনীতিবিদ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের দিকে ইঙ্গিত করছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঢাকায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তদন্তে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ফয়সাল করিম মাসুদকে মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করে। চলতি বছরের মার্চ মাসে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স মেঘালয় থেকে ফয়সাল করিম মাসুদ, আলমগীর হোসেন এবং ফিলিপ সাংমাকে গ্রেপ্তার করে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, অন্য একটি দেশে নির্বাচনে পরাজিত কোনো নেতার বক্তব্য নিয়ে আলোচনার সুযোগ নেই। তবে ভারত সরকার যদি ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য শেয়ার করে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলেও তিনি জানান। তদন্ত ইতিমধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, এর আগে প্রণব মুখার্জি একই ধরনের কথা বলেছিলেন, এবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইঙ্গিতে বললেন। এটাই যদি বন্ধু রাষ্ট্রের আচরণ হয়, তাহলে শত্রু রাষ্ট্র কেমন হবে, সে প্রশ্নও তিনি রাখেন।
গণবিপ্লবী উদ্যোগের প্রতিনিধি ও এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব আরিফ সোহেল বলেন, ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাবশালী অবস্থানের কারণে তার প্রতিটি মন্তব্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। তবে বর্তমানে উভয় দেশই পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নীতি অনুসরণ করায় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এদিকে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইডি জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আলামত, ফরেনসিক বিশ্লেষণ ও ডিজিটাল তথ্যের সমন্বয়ে তারা একটি সুপরিকল্পিত আন্তঃদেশীয় অপরাধমূলক যোগসূত্র শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, ভারতে গ্রেপ্তার আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কূটনৈতিক ও আইনি তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
উল্লেখ্য, ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের বিরুদ্ধে বিদেশের মাটিতে গুপ্তহত্যার অভিযোগ আগেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালে কানাডায় শিখ নেতা হারদীপ সিং নিজ্জার হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রেও শিখ রাজনৈতিক কর্মী গুরপতবন্ত সিং পান্নুনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ ওঠে ভারতীয় গোয়েন্দাদের বিরুদ্ধে। ভারত সরকার শুরু থেকেই এ অভিযোগগুলো অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তবে ২০২৬ সালে এসে কানাডার নতুন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছে এবং সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ কার্যদল সক্রিয় করা হয়েছে। এনসিপি বা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে মমতার মন্তব্যের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
আরও পড়ুন:








