রুমিন ফারহানার আদি নিবাস অর্থাৎ তাঁর বাবা অলি আহাদের বাড়ি বিজয়নগর উপজেলার বুধন্তি ইউনিয়নে। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য হওয়ার পর তিনি উপলব্ধি করেন যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান সুদৃঢ় করা সহজ হবে না। একদিকে বিএনপির দলীয় রাজনীতিতে ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামলের শক্ত অবস্থান, অন্যদিকে সরাইল-আশুগঞ্জে বিএনপির সাবেক জেলা সভাপতি সাত্তার সাহেব অনুপস্থিত৷ সব মিলিয়ে তিনি সরাইল-আশুগঞ্জের রাজনীতিকে নিজের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন। জুলাই-পরবর্তী সময়ে রুমিন ফারহানার রাজনৈতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সঙ্গে তার বহিরাগত তকমা থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে বিজয়নগর উপজেলা থেকে তিনটি ইউনিয়ন বিচ্ছিন্ন করে। যদিও আমাদের আন্দোলনের মুখে হরষপুর ইউনিয়ন পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
কবির আহমেদ ভূইয়ার বাড়ি সদর উপজেলার সীমানা ঘেঁষা বরিশল গ্রামে। তাঁর ভাই সানি যখন তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন, তখন কবির আহমেদ ভূইয়ার রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়তে থাকে। মুশফিকুর রহমান দীর্ঘদিন রাজনৈতিকভাবে অনুপস্থিত থাকায় কসবা-আখাউড়া অঞ্চলে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতার সুযোগে তিনি নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন। বর্তমানে রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সদর উপজেলার বরিশল এলাকাকে ইউনিয়নে রূপান্তর করে আখাউড়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে তিনিও বহিরাগত পরিচয়ের বিতর্ক থেকে অনেকটাই বেরিয়ে আসার সুযোগ পেয়েছেন। এখন তিনি নিজস্ব একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিজয়নগরের সিংগারবিল ইউনিয়ন, সদর উপজেলার বাসুদেব ইউনিয়ন এবং কসবা উপজেলার গোপীনাথপুরকে একত্র করতে চাচ্ছেন।
প্রশ্ন হলো, এখানেই কি এই প্রক্রিয়া থেমে যাবে?
একইভাবে সদর উপজেলার পূর্ব তালশহর ইউনিয়নে জন্ম নেয়া বিএনপি জোটের নেতা মাওলানা জুনাইদ আল হাবীব সরাইল-আশুগঞ্জের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। ভবিষ্যতে তাঁর হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা এলে বহিরাগত তকমা দূর করার জন্য তালশহর পূর্ব ইউনিয়ন বা বুধল ইউনিয়নের সীমানা পরিবর্তনের দাবি উঠবে না এমন নিশ্চয়তা কি দেয়া যায়?
আবার সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নাদিয়া ইসলাম পাপনও কি ভবিষ্যতে চান্দুরা ইউনিয়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ভিত্তি গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন না?
বাস্তবে রুমিন ফারহানা, কবির আহমেদ ভূইয়া ও জুনায়েদ আল হাবিব ৩ জনই চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের রাজনীতি করতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচনী সীমানার প্রান্তবর্তী এলাকায় জন্মগ্রহণ এবং শক্তিশালী স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এড়িয়ে তাঁরা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান গড়ে তোলার পথ বেছে নিয়েছেন।
এসব প্রশ্নের মধ্যেই একটি বড় উদ্বেগ লুকিয়ে আছে—বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ কি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষের জন্য আশীর্বাদ, নাকি অভিশাপ?
একটি এলাকার রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব কিংবা প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের প্রশ্ন কখনোই শুধু ব্যক্তি বা দলীয় সুবিধার আলোকে বিবেচিত হওয়া উচিত নয়। বরং এর মূল ভিত্তি হওয়া উচিত দীর্ঘমেয়াদি জনস্বার্থ।
গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নেতৃত্বের বিকাশ হওয়া উচিত জনগণের আস্থা, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক কর্মধারার ভিত্তিতে। যদি কোনো নেতা বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য বারবার সীমানা পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজন হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে—এটি কি জনস্বার্থে করা হচ্ছে, নাকি বিশেষ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য?
বিজয়নগর, সদর, সরাইল, আশুগঞ্জ, কসবা কিংবা আখাউড়া—প্রতিটি অঞ্চলের মানুষের নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয়, ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক বাস্তবতা রয়েছে। এসব বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয়া হলে তার নেতিবাচক প্রভাব স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ এবং জনগণের কার্যকর প্রতিনিধিত্বের ওপর পড়তে পারে।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—বর্তমান প্রজন্মের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য কী ধরনের সুযোগ কিংবা সীমাবদ্ধতা তৈরি করছে? যদি রাজনৈতিক মানচিত্র এমনভাবে গড়ে তোলা হয়, যেখানে স্থানীয় নেতৃত্বের স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পুরো অঞ্চলই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, রাজনৈতিক ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়। ব্যক্তি, পদ ও প্রভাব সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। কিন্তু জনগণের স্মৃতি, সামাজিক বাস্তবতা এবং ইতিহাসের মূল্যায়ন দীর্ঘস্থায়ী। তাই আজকের প্রতিটি সিদ্ধান্তই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে জবাবদিহির বিষয় হয়ে থাকবে।
রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তন করা সম্ভব, প্রশাসনিক মানচিত্রও পুনর্নির্ধারণ করা যায়; কিন্তু জনগণের মতামত, ঐতিহাসিক বাস্তবতা এবং একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক চরিত্রকে সহজে বদলানো যায় না। তাই যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামত, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের বিকাশকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া প্রয়োজন।
শেষ পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নয়, জনগণের স্বার্থই হওয়া উচিত সকল রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রধান বিবেচ্য বিষয়।
আরও পড়ুন:








