বুধবার

৩ জুন, ২০২৬ ২০ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

আ.লীগ পুনর্গঠনে রেহানার বলয় কোণঠাসা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ জুন, ২০২৬ ০৮:৫০

আপডেট: ৩ জুন, ২০২৬ ০৮:৫১

শেয়ার

আ.লীগ পুনর্গঠনে রেহানার বলয় কোণঠাসা
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

গণআন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় এক বছর পর আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন দলের সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই প্রক্রিয়ায় তিনি তার ছোট বোন শেখ রেহানার ঘনিষ্ঠ বলয়কে দলীয় রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরিয়ে দিচ্ছেন বলে দলের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, ২০২৪ সালের আগস্টে নাটকীয়ভাবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অবস্থান করছেন। সেখান থেকেই তিনি সাংগঠনিক কার্যক্রম সরাসরি তদারকি করছেন এবং জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের সংগঠকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন।

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম জানান, শেখ হাসিনা হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও ফোন কলের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। এই কৌশলের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া অনেক নেতাকর্মী আবার সক্রিয় হয়ে উঠছেন বলেও তিনি জানান।

দলীয় জ্যেষ্ঠ নেতারা এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আওয়ামী লীগের একটি বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ আত্মমূল্যায়ন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের মতে, দলের বিপর্যয় ও পতনের পেছনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, দুর্নীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং জনগণের ক্ষোভ মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরেই শেখ রেহানা ও তার দেবর এবং শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিককে ঘিরে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক বলয় গড়ে ওঠার বিষয়টি দলের অভ্যন্তরে আলোচিত ছিল। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে এই নেটওয়ার্ক রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে ব্যাপকভাবে আলোচিত হতো।

দলীয় সূত্রের দাবি, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা পদ, বেসামরিক প্রশাসন, সামরিক বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ পদে নিয়োগে এই বলয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। এ ছাড়া বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও বদলিতে বিপুল আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও দলের ভেতরে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল, যদিও সে সময় কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি সূত্র আরও অভিযোগ করে, সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে বড় ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা রেহানার এই বলয়কে কেন্দ্র করে অত্যন্ত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠেন। এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমান, এস আলম গ্রুপের প্রভাব এবং সামরিক প্রশাসনে তারিক সিদ্দিকের ভূমিকার প্রসঙ্গ উত্থাপন করা হয়।

তবে দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাহাউদ্দিন নাছিম বিতর্কিত নেতাদের কোণঠাসা করার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেন এবং একে রাষ্ট্রযন্ত্রের গভীর থেকে কোনো পক্ষের পরিকল্পিত অপপ্রচার বলে অভিহিত করেন।

ইউরোপে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের একজন নেতা জানান, শেখ হাসিনা এখন জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে কম বিতর্কিত নেতাদের নিয়ে দল পুনর্গঠন করতে চান। দুর্নীতি, বিতর্ক এবং জনগণের ক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকার বিষয়ে সভাপতি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন বলেও তিনি জানান।

দলের সঙ্গে যুক্ত একাধিক সূত্র জানায়, যেসব নেতা সাংগঠনিক পুনর্গঠনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছেন, তারা শেখ হাসিনার আস্থা অর্জন করছেন। এই তালিকায় যাদের নাম বারবার উঠে আসছে তারা হলেন সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম; সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল; যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম; সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ এ আরাফাত।

সূত্র মতে, নানক, মায়া ও শেখ সেলিম ইতিমধ্যে শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বেশ কয়েকটি ভার্চুয়াল দলীয় সভায় সভাপতিত্ব করেছেন, যা দলীয় মহলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব কাঠামোর ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ছাড়া নওফেল এবং আরাফাত আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক তৎপরতায় আগের তুলনায় অনেক বেশি দৃশ্যমান ভূমিকা রাখছেন।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের রাজনৈতিক গুরুত্ব শেখ হাসিনা ক্রমেই উপলব্ধি করছেন বলে সূত্রগুলো জানায়। এই প্রেক্ষাপটে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, সাবেক মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী এবং নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর নাম আলোচনায় রয়েছে।

ভবিষ্যতের রাজনৈতিক আন্দোলন ও কর্মসূচি সফল করতে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে তরুণ নেতৃত্ব গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে আওয়ামী লীগ। দলীয় সূত্র অনুযায়ী, ভবিষ্যতের সরকারবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের জন্য এই চারটি মহানগরীকে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন শেখ হাসিনা।



banner close
banner close