নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের ঘনিষ্ঠ দুই বিএনপি নেতার নেতৃত্বে সহিংসতা, চাঁদাবাজি, জমি দখল ও মিথ্যা মামলার মাধ্যমে ত্রাসের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এ পর্যন্ত বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের চারশোরও বেশি নেতাকর্মী হামলা ও মামলার শিকার হয়েছেন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, লালপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান হারুনুর রশিদ পাপ্পু এবং বাগাতিপাড়া থানা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোশারফ হোসেনের নেতৃত্বে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দুজনই প্রতিমন্ত্রী পুতুলের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। প্রতিমন্ত্রীর প্রশ্রয়ে তাদের বাহিনী সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন। এ কারণে স্থানীয় পুলিশ ও প্রশাসন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
গত নির্বাচনে প্রতিমন্ত্রী পুতুলের বিপরীতে বিএনপির সাবেক সহ-দপ্তর সম্পাদক ও স্বতন্ত্র প্রার্থী তাইফুল ইসলাম টিপুর পক্ষে কাজ করা নেতাকর্মীরাই মূলত হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছেন। নির্বাচনের পর থেকে এই অনুসারীদের মারধর, বাড়িঘরে হামলা ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হচ্ছে বলে অভিযোগ।
ভুক্তভোগীদের বর্ণনা
লালপুরের ওয়ালিয়া বাজারে স্থানীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আউলিয়া হোসেনের ছেলে শামীম আহমেদ জানান, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে তাদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালানো হয়। তাকে মারধর করার পর পুলিশি তল্লাশির নামে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা সাজিয়ে তার বাবাকে অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়। বাবা এখনো কারাবন্দি। হামলার ঘটনায় মামলা করতে গেলে পুলিশ নেয়নি।
নাটোর জেলা ছাত্রদলের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান সোহাগ জানান, তার দুটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মামলা করতে গেলে পুলিশ না নিয়ে উল্টো তাকেই একটি মামলার আসামি করা হয়েছে।
মনিহারপুর গ্রামের কৃষক ও বিএনপি কর্মী মাইনুল ইসলাম জানান, ঈদুল ফিতরের নামাজের পর তাকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়া হয়। ভাঙা হাতে এখনো রড লাগানো রয়েছে। তার বাড়িতে হামলা এবং আমবাগান কেটে ফেলা হয়েছে। পরিবারের সদস্যদেরও মিথ্যা মামলায় আসামি করা হয়েছে।
দুড়দুড়িয়া ইউনিয়ন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও স্থানীয় ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল হান্নান জানান, চাঁদার দাবিতে তার স'মিল, ডেকোরেটর ও কাঠের ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করায় মিথ্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার ছেলে মাসুম আহমেদ জানান, প্রতিমন্ত্রীর একজন অনুসারী তার গায়ে আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে গুলির হুমকি দিয়েছেন।
বাগাতিপাড়ায়ও একই চিত্র
বাগাতিপাড়া পৌর ছাত্রদলের সদস্য সচিব সবুজ আলী জানান, মোশারফ হোসেনের অনুসারীরা তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে তাকে মারধর করে নগদ টাকা লুট করে নিয়ে যায়।
দেবনগর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সালামের ভাষ্য অনুযায়ী, একমাস আগে গ্রামের শাজাহান নামে একজনকে মারধর করে তার বাড়ির কিছু অংশ দখল করে নেওয়া হয়। পরে মিথ্যা মামলায় তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
দয়ারাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আনসার আলী সরকারকে নির্বাচনের পরদিনই গৃহবন্দি করে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘনিষ্ঠজনেরা জানান, অব্যাহত হুমকির কারণে পরে তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা যান।
আওয়ামী লীগ নেতাদের পুনর্বাসনের অভিযোগ
অভিযোগকারীরা জানান, প্রতিমন্ত্রী পুতুল দায়িত্ব নেওয়ার পর তার ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে দুই উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের তিন হাজারেরও বেশি নেতাকর্মী পুনর্বাসিত হয়েছেন। লালপুরের ১৫টি ইউনিয়নের মধ্যে মাত্র চারটির চেয়ারম্যান বিএনপিপন্থী। বাকিরা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা হলেও তারা প্রতিমন্ত্রীর অনুসারীদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে দাবি করা হয়।
আড়বাব ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক এ কে এম জালাল উদ্দিন বলেন, ত্যাগী নেতাকর্মীরা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এই সুযোগে আওয়ামী লীগের বিতর্কিত নেতাকর্মীরা দলে ঢুকে যাচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে নাটোরে বিএনপির ক্ষতি হবে।
লালপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুর রহমান অভিযোগ করেন, পাপ্পু ও তার সহযোগীরা ইজারা ছাড়াই লালপুর হাটের খাজনা তুলে আত্মসাৎ করছেন। গত অর্থবছরে এই হাট ৩২ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছিল। এ বছর সরকার সেই রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া বালুমহাল ও কৃষিজমি থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে। বালু ব্যবসায় বাধা দেওয়ায় এক ঘটনায় পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন বলেও তিনি জানান।
অভিযুক্তদের বক্তব্য
অভিযোগ সম্পর্কে হারুনুর রশিদ পাপ্পু বলেন, অভিযোগকারীরা রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছেন এবং প্রতিমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এসব অভিযোগ করা হচ্ছে। নির্বাচনের পর বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটে থাকতে পারে স্বীকার করে তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর পক্ষে কাজ করা নেতাকর্মীরা প্রতিপক্ষের ওপর হামলা করেছেন, এমন তথ্য তার কাছে নেই।
মোশারফ হোসেন তার বিরুদ্ধে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপে যুক্ত নন। শহীদুল ইসলামও অভিযোগগুলোকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেন।
প্রশাসনের অবস্থান
লালপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম পলাশ বলেন, তার দায়িত্ব গ্রহণের পর অভিযোগ নিয়ে এসে মামলা না হওয়ার কোনো ঘটনা ঘটেনি।
লালপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জুলহাস হোসেন সৌরভ বলেন, সব অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না, তবে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও পুলিশের ভূমিকা জরুরি বলে তিনি মন্তব্য করেন। হাট ও বালুমহাল ইজারা না হওয়ায় অবৈধ কার্যক্রম বন্ধে চেষ্টা চলছে বলেও তিনি জানান।
প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমিন পুতুলের বক্তব্য নেওয়ার একাধিক চেষ্টা করা হয়। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা নিষ্ফল হয়। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো সাড়া মেলেনি।
এদিকে ভুক্তভোগীরা পরিস্থিতির অবসান চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে একাধিক আবেদন জমা দিয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে তারা জানান।
আরও পড়ুন:








