সংবিধানের ১৮তম সংশোধনীর লক্ষ্যে প্রস্তাবিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) অংশ নেবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংবিধান সংশোধনের পরিবর্তে সংবিধান সংস্কারের দাবিতে অনড় অবস্থানে রয়েছে দল দুটি। এ অবস্থায় সরকারি দল বিএনপির প্রস্তাবিত ১৭ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটি এখনো গঠন করা সম্ভব হয়নি।
ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে গত ২৯ এপ্রিল আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান সংবিধান সংশোধনের জন্য বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। তিনি জানান, সরকারি দলের পক্ষ থেকে ১২ সদস্যের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এর মধ্যে বিএনপির সাতজন এবং গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে পাঁচজনকে রাখা হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে আরও পাঁচজনের নাম চাওয়া হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, সংসদে সদস্যসংখ্যার অনুপাতে বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি আসন রাখা হয়েছে। বিরোধী দল নাম দিলে পরদিনই কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে উপস্থাপন করা হতো। তবে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এখনো কোনো নাম জমা দেওয়া হয়নি।
প্রস্তাবের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির শফিকুর রহমান সংসদে বলেন, সংবিধান সংশোধনের প্রশ্নে তাদের সঙ্গে সরকারি দলের ধারণাগত পার্থক্য রয়েছে। তিনি জানান, তাদের দল সংবিধান সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এ বিষয়ে দলীয় আলোচনার পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার ১৭ দিন পরও জামায়াত ও এনসিপির পক্ষ থেকে কোনো সদস্যের নাম দেওয়া হয়নি। আগামী ৭ জুন শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনকে সামনে রেখে বিশেষ কমিটি গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, তাদের দল বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে কোনো সদস্য দেবে না। তিনি বলেন, এই কমিটি গণভোটের রায়ের প্রতিফলন ঘটাতে পারবে না। তার দাবি, গণভোটে অধিকাংশ মানুষ জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে মত দিয়েছে। সে অনুযায়ী জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোটের ৭৭ জন সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
তবে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেছেন, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম-আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম জানিয়েছেন, তাদের দলও বিশেষ কমিটিতে প্রতিনিধি পাঠানোর সম্ভাবনা দেখছে না। কারণ, এনসিপিও সংবিধান সংস্কার পরিষদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বিদ্যমান সংবিধানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের সুযোগ নেই। তিনি অভিযোগ করেন, কাউকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়িয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার সাংবিধানিক সীমা অতিক্রম করেছেন।
এর আগে গত ৩১ মার্চ সরকারি দল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশকে প্রতারণামূলক আখ্যা দিয়ে সর্বদলীয় কমিটি গঠনের সুপারিশ করে। সরকারি দলের দাবি, জুলাই জাতীয় সনদে বিভিন্ন বিষয়ে বিএনপিসহ কয়েকটি দলের ভিন্নমত থাকলেও জারিকৃত আদেশে তা উল্লেখ করা হয়নি।
এদিকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের দাবিতে জামায়াত-এনসিপিসহ ১১ দলীয় জোট বিভাগীয় সমাবেশ শুরু করেছে। শনিবার রাজশাহী থেকে এ কর্মসূচি শুরু হয়। জোটটির পক্ষ থেকে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে সমাবেশ এবং পরে ঢাকায় মহাসমাবেশ করার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারিকৃত জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে বলা হয়েছিল, ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে পরিচালিত হবে। এই সময়ের মধ্যে ৪৮টি সাংবিধানিক সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। তবে এসব প্রস্তাবের বেশ কয়েকটিতে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।
এর আগে ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটিতেও তৎকালীন বিরোধী দল বিএনপি অংশ নেয়নি। ওই সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল।
আরও পড়ুন:








