বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, গ্রেপ্তার ও হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর উত্তরা, মোহাম্মদপুর, লালবাগ ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে দলটির নেতাকর্মীরা এসব ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপি নেতারা। তাদের দাবি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আড়ালে কৌশলে ত্যাগী নেতাকর্মীদের ফাঁসানো হচ্ছে। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকার ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
মে মাসের শুরু থেকে দেশজুড়ে চাঁদাবাজ, দখলদার ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবে বিএনপির অভিযোগ, এই অভিযানে দলটির নিরীহ ও ত্যাগী নেতাকর্মীদেরও আসামি করা হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবি ও ভিডিও বিকৃত করে নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এমন অভিযোগ করেছেন ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রদলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর রহমান নির্ঝর। তিনি জানান, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রলীগের একটি কথিত কমিটিতে তাঁর নাম যুক্ত করে প্রচার চালানো হয়। এ ঘটনায় তিনি গত ২৩ এপ্রিল উত্তরা পশ্চিম থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ২ মে তাঁকে থানায় ডেকে নেওয়া হয় এবং পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬-এর ৭৫ ধারায় তিন দিনের সাজা দিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়।
তানভীর রহমান দাবি করেন, তিনি দীর্ঘদিন ছাত্রদল ও যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং বর্তমানে উত্তরা পশ্চিম থানা যুবদলের পদপ্রত্যাশী।
একই দিনে উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপির সদস্য রেজাউল কবিরকেও পুলিশ বাসা থেকে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাঁকে জানানো হয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধীর তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। আদালতে হাজির করার পর তাঁকে নয় দিনের সাজা দেওয়া হয়। তবে তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কী, তা তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ খালিদ মনসুর বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৈরি করা চাঁদাবাজদের তালিকায় তানভীর রহমান নির্ঝর ও রেজাউল কবিরের নাম ছিল। সেই তালিকার ভিত্তিতেই তাদের গ্রেপ্তার করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সাজা বিষয়ে সিদ্ধান্ত আদালতের বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সমকালের যাচাই অনুযায়ী, এ ধরনের অন্তত ১৭টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিএনপি নেতাকর্মীদের দাবি, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
উত্তরা পশ্চিম থানা বিএনপি নেতা আজহারুল ইসলাম অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একটি মহলের অভিযোগের ভিত্তিতে সম্প্রতি বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের টার্গেট করা হচ্ছে।
উত্তরা পশ্চিম থানা যুবদল নেতা ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি অংশ পরিকল্পিতভাবে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে।
ঢাকা মহানগর বিএনপির কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, রাজধানীর উত্তরা ও মোহাম্মদপুর এলাকায় অভিযান বেশি চলছে। তাদের মতে, অপরাধ দমনে অভিযান প্রয়োজন হলেও নিরীহ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
মহানগর উত্তরা পূর্ব থানা বিএনপির নেতা আহসান হাবীব অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী পরিচয় বদলে বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের কেউ কেউ প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবহার করে অপরাধের দায় প্রকৃত বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন।
রাজধানীর দক্ষিণাঞ্চলেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। লালবাগ যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দেলোয়ার হাকিম বিপ্লব জানান, ১ মে রাতে তাঁকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ এবং চাঁদাবাজির অভিযোগ আনা হয়। পরে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হস্তক্ষেপে তিনি মুক্তি পান।
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক জহিরউদ্দিন তুহিন অভিযোগ করেন, যাত্রাবাড়ী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আলাউদ্দিন মানিককে ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে চাঁদাবাজির মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। এ ঘটনায় সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁর পদ স্থগিত করতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। তবে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে তা দুঃখজনক। তিনি বলেন, কাউকে অহেতুক হয়রানি করার আইনি সুযোগ নেই।
আরও পড়ুন:








