সোমবার

১১ মে, ২০২৬ ২৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

সংবিধান সংশোধন না সংস্কার, সমঝোতার পথ খুঁজছে সরকার-বিরোধী দল

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১১ মে, ২০২৬ ০৭:৫৫

শেয়ার

সংবিধান সংশোধন না সংস্কার, সমঝোতার পথ খুঁজছে সরকার-বিরোধী দল
ছবি সংগৃহীত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনায় এসেছে সংবিধান সংশোধন ও সংবিধান সংস্কার বিতর্ক। সরকার গঠনকারী বিএনপি বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী জোট, বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি গণভোটে অনুমোদিত জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে।

বিতর্কের সূচনা হয় গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে। ওইদিন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসন পাওয়া জামায়াতে ইসলামী ও তাদের জোটসঙ্গী এনসিপির নির্বাচিত সদস্যরা দুটি পৃথক শপথ নেন। একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার কমিটির সদস্য হিসেবে। তবে বিএনপির সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ শপথ অনুষ্ঠানে বলেন, দ্বিতীয় শপথপত্রটি সংবিধানের আলোকে নয়। এ কারণে তারা সেই শপথ গ্রহণ করবেন না। পরবর্তীতে সংসদের প্রথম অধিবেশনেও বিষয়টি নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে আলোচনা ও মতবিরোধ দেখা দেয়।

জুলাই আন্দোলনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর ধারাবাহিকতায় গত বছরের ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ স্বাক্ষরিত হয়। সনদে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি ছিল সংবিধান সংশ্লিষ্ট।

এসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জুলাই জাতীয় সনদ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ জারি করা হয়। পরে জনগণের মতামত যাচাইয়ের জন্য গণভোট অধ্যাদেশ জারি করা হয় এবং গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।

সনদ অনুযায়ী নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের কথা ছিল। সেই সময়সীমা শেষ হয় গত ১৫ মার্চ। বিরোধী জোটের দাবি, গণভোটে জনগণের সমর্থন পাওয়ায় এখন সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন বাধ্যতামূলক।

তবে সরকার ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, সংবিধান সংশোধনের জন্য ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারি দলের ১২ এবং বিরোধী দলের পাঁচ সদস্য রাখার কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, বিরোধী দল নাম দিলে সংবিধান সংশোধন–সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি গঠন করে জুলাই সনদ সামনে রেখে তারা এগিয়ে যেতে চান।

এ প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া দেয়নি বিরোধী দল। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার কমিটি গঠন করতে হবে। সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধন কমিটির পক্ষে তারা নেই। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তালিকা দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়েও এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।

অপরদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, সরকার জুলাই সনদের প্রতিটি ধাপ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে সংবিধানের বাইরে গিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার পক্ষে তারা নন।

এদিকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবিতে রাজপথে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। জোট নেতারা জানিয়েছেন, আগামী ১৬ মে রাজশাহীতে বিভাগীয় সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। পরে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন বিভাগে কর্মসূচি পালন শেষে অক্টোবরে ঢাকায় মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বিষয়টিকে রাজনৈতিক মতপার্থক্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, পৃথিবীর প্রায় সব সংবিধানেই সুন্দর নীতিমালা লেখা থাকে, কিন্তু বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ। সংশোধন না সংস্কার, এ বিতর্কের সমাধান রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমেই সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

বর্তমানে সরকার ও বিরোধী জোট উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকায় সংবিধান সংশ্লিষ্ট এ বিতর্ক দেশের রাজনীতিতে নতুন করে অচলাবস্থার আশঙ্কা তৈরি করেছে।



banner close
banner close