বুধবার

৮ এপ্রিল, ২০২৬ ২৫ চৈত্র, ১৪৩২

মন্ত্রী-এমপিদের বলয়ে আ.লীগ: তৃণমূলে বাড়ছে ক্ষোভ, চাপে ত্যাগীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১২:২৬

শেয়ার

মন্ত্রী-এমপিদের বলয়ে আ.লীগ: তৃণমূলে বাড়ছে ক্ষোভ, চাপে ত্যাগীরা
ছবি: এআই জেনারেট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট। দীর্ঘ দেড় যুগের আন্দোলন-সংগ্রামের পর অর্জিত এই সাফল্যে যেমন স্বস্তি এসেছে, তেমনি দলটির তৃণমূল পর্যায়ে দেখা দিয়েছে নতুন অস্বস্তি ও অসন্তোষ।

দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক ব্যক্তি এখন বিএনপি সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের ঘনিষ্ঠ বলয়ে সক্রিয় হয়ে উঠছেন। বিপরীতে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা ক্রমেই কোণঠাসা হয়ে পড়ছেন। এতে সংগঠনের ভেতরে ক্ষোভ বাড়ছে এবং ভবিষ্যতে এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক সুবিধা নেওয়া, মামলা-মোকদ্দমা থেকে রেহাই পাওয়া এবং ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যেই আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। একাধিক বিএনপি নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই নিজেদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখতে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখছেন।

তবে তৃণমূলের নেতাদের মতে, এ ধরনের প্রবণতা সংগঠনের জন্য ক্ষতিকর। তারা মনে করছেন, দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন না হলে দলের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। তাদের ভাষ্য, “যারা কঠিন সময়ে পাশে ছিল, তাদের অবমূল্যায়ন করা হলে সংগঠন টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।”

মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে নতুনভাবে সক্রিয় হয়েছেন এমন কিছু ব্যক্তি, যাদের অতীত রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে। প্রভাবশালী নেতাদের আশ্রয়ে তারা দলীয় কাঠামোর ভেতরে জায়গা করে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সিলেট, রংপুরসহ বিভিন্ন বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ছাত্রদল ও যুবদলের অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী এখন মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত। বরং যারা আগে মাঠে সক্রিয় ছিলেন না বা সুযোগ বুঝে দল পরিবর্তন করেছেন, তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর চেষ্টা চলছে। এতে দীর্ঘদিন আন্দোলনে থাকা নেতাদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।

একজন ছাত্রদল নেতা বলেন, “আমরা যখন রাজপথে ছিলাম, তখন অনেকেই অনুপস্থিত ছিল। এখন তারাই এসে গুরুত্বপূর্ণ পদ দখলের চেষ্টা করছে।”

একই ধরনের অভিযোগ রংপুর বিভাগেও পাওয়া গেছে। সেখানে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি এখন বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে প্রভাব বিস্তার করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নেতারা।

দলীয় সূত্রে আরও জানা গেছে, ‘হাইব্রিড’ ও সুবিধাবাদী নেতাদের প্রভাব বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, দলের ভেতরের কিছু সুবিধাভোগী নেতা নিজেদের শক্ত বলয় তৈরির জন্য এসব ব্যক্তিকে দলে জায়গা করে দিচ্ছেন। ফলে ত্যাগী নেতারা পিছিয়ে পড়ছেন।

যশোর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, বরিশালসহ বিভিন্ন জেলা থেকে একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও বাসস্ট্যান্ড, বাজার, বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে নতুনভাবে সক্রিয় হওয়া নেতাদের বিরুদ্ধে।

বরিশালে অভিযোগ রয়েছে, কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে গুরুত্বপূর্ণ বাসস্ট্যান্ড ও বাণিজ্যিক এলাকা। অন্যদিকে, যারা দীর্ঘদিন মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন, তারা এখনো আর্থিক সংকট ও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম মহানগরেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করেছেন, দুঃসময়ে নেতৃত্ব দেওয়া ত্যাগী নেতারা এখন অবহেলিত। আর যেসব ব্যক্তি অতীতে মাঠে সক্রিয় ছিলেন না কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, তারা বর্তমানে দলীয় কাঠামোয় বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন।

বিএনপির শীর্ষ নেতারা অবশ্য দাবি করেছেন, পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীদের বাদ দেওয়া হবে না। তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্রই তুলে ধরছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সার্বিকভাবে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা বলছেন, অনুপ্রবেশ, গ্রুপিং ও সুবিধাবাদী রাজনীতি নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এজন্য দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।



banner close
banner close