শুক্রবার

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২৪ মাঘ, ১৪৩২

হাদিকে রিকশায় গু’লি, এরপর নীরবতা: দ্য থ্রি’র আর্টিকেল

ডেস্ক রিপোর্ট, বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ২২:০৩

শেয়ার

হাদিকে রিকশায় গু’লি, এরপর নীরবতা: দ্য থ্রি’র আর্টিকেল
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই চেতনাকে ধারণ করে দ্য থ্রি নামে একটি অনলাইন সাইট চালু করেছে লেখক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অনলাইন অ্যক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্য। মূলত বাংলাদেশ এবং দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাধীন সংবাদিকতার প্রয়াস নিয়ে যাত্র শুরু করেছে এই মাধ্যমটি। এরইমধ্যে, দ্য থ্রির ফেসবুক পেইজও চালু করা হয়েছে। যেখানে অন্তত ৩২ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকরী পেইজটি অনুসরণ করছে। এখানে স্থান পাচ্ছে জুলাই আন্দোলন নিয়ে লেখা বিভিন্ন লেখকের নানা আর্টিকেল, মত এবং চিন্তাভাবনা।

পেইজটিতে শহীদ ওসমান হাদিকে নিয়ে এবাদুর রহামনের লেখা একটি আর্টিকেল পোস্ট করা হয়েছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে অন্তত ৫ হাজারের বেশি

এবাদুর রহমান তাঁর লেখায় ক্যাপশন দিয়েছেন, ওসমান হাদীর জীবন ও মৃত্যু । এর ব্যখ্যা হিসাবে লিখেছেন, "ধর্মনিরপেক্ষ উদারনীতির অবসান, অবদমিত ঐতিহ্যের প্রত্যাবর্তন, আমাদের প্রকৃত বহুত্ববাদের জন্য পর্যাপ্ত রাজনৈতিক রূপ কল্পনা করার সংগ্রামের সাথে সম্পর্কিত সংকট এবং সম্ভাবনার একটি পূর্বসূরী"।

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনে জুমার নামাজের পর রিকশায় যাওয়ার সময় হাদিকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। মাথায় গুলি লেগে, গুরুতরভাবে আহত হন তিনি। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল, পরে এভারকেয়ার হাসপাতাল এবং শেষে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুরে নেয়া হয়। এবাদুর লিখেছেন, এই ঘটনাটি শুধু একজন মানুষের ওপর হামলা নয়; এটি আমাদের রাজনীতি ও সমাজ সম্পর্কে অনেক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরেছে।

এই আর্টিকেলে বলা হয়েছে, হাদি কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি এমন এক ধরনের রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করতেন যা আমাদের প্রচলিত চিন্তাধারার সাথে খাপ খায় না। তাই তাকে সহজেই “অগ্রহণযোগ্য” করে তোলা হয়েছে।

হাদি রাজনীতি করতেন খুব সাধারণভাবে। তিনি বড় মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিতেন না, দামি গাড়িতে চলতেন না। রিকশায় চড়ে মানুষের কাছে যেতেন, মসজিদে নামাজের পর মানুষের সাথে কথা বলতেন, হাত মিলাতেন। অর্থাৎ তিনি রাজনীতি করতেন কাছ থেকে- মানুষের সাথে সরাসরি মিশে। এতে করে, রাজনীতি কোনো দূরের বিষয় না থেকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠত।

তবে, আধুনিক রাজনীতি সাধারণত এই ঘনিষ্ঠতাকে পছন্দ করে না। এখানে রাজনীতি মানে দূরত্ব—নেতা আলাদা, মানুষ আলাদা। হাদি এই দূরত্ব ভেঙে ফেলেছিলেন, আর সেটাই অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে বলে মনে করেন লেখক এবাদুর।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিচয়ের প্রশ্ন। আমাদের সমাজে এখনো একটা ধারণা কাজ করে—আধুনিক ও শিক্ষিত হতে হলে ধর্মকে ব্যক্তিগত বিষয় বানাতে হবে। হাদি সেই ধারণা মানেননি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, শিক্ষকতা করেছেন, তবে একই সাথে ইসলামী পোশাক পরেছেন, প্রকাশ্যে ধর্মীয় ভাষায় কথা বলেছেন। তিনি দেখিয়েছেন যে আধুনিকতা আর ধর্ম একসঙ্গে থাকতে পারে।

হাদির এই অবস্থান তাকে সমাজে অনেকের কাছে “মাথাব্যাথার” কারণ করে তোলে। তিনি সমাজের চিরচেনা দেয়াল ভেঙে দেন- ধর্ম একদিকে, রাজনীতি আর আধুনিকতাকে আরেকদিকে দাঁড় করিয়ে দেন।

লেখাটি আরও বলা হয়েছে, হাদির ওপর হামলার আগে তার বিরুদ্ধে একটা নীরবতা কাজ করছিল। সব মানুষ সমানভাবে আলোচনায় আসে না, সব মানুষের কষ্ট সমান গুরুত্ব পায় না। কেউ আহত হলে আমরা খুব সহজে শোক প্রকাশ করি, আবার কারও ক্ষেত্রে আমরা চুপ থাকি। হাদি সেই মানুষদের একজন, যাকে নিয়ে সমাজের কিছু অংশ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি।

ফিলিস্তিনের মানুষের কষ্ট নিয়ে আমরা সহজে কথা বলি, প্রতিবাদ করি। তবে, নিজের দেশের ভেতরে, যখন ভিন্ন ধরনের রাজনীতি বা পরিচয়ের মানুষ আক্রান্ত হয়, তখন আমরা অনেক সময় নীরব থাকি। এই দ্বৈত আচরণ লেখাটি তুলে ধরেছেন লেখক।

এছাড়াও এবাদুর লিখেছেন, হাদি কোনো পশ্চাৎপদ চিন্তার প্রতিনিধি নন। তিনি এমন এক ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন, যেখানে ধর্ম, নৈতিকতা আর রাজনীতি একসঙ্গে নতুনভাবে ভাবা যায়। তাকে গুলি করা হয়েছে শুধু একজন মানুষ হিসেবে নয়, সেই সম্ভাবনাকে থামানোর জন্য।

সবেশেষে এবাদুর রহমান লিখেছেন, হাদি বেঁচে থাকুন বা না থাকুন, তার ওপর হওয়া এই হামলা আমাদের জিজ্ঞেস করতে বাধ্য করে- আমরা কার কথা শুনি, কাদের কষ্ট দেখি, আর কাকে আমরা নীরবভাবে অদৃশ্য করে দিই।



banner close
banner close