শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের হীরা, মুক্তা, প্লাটিনাম ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়। বৃহস্পতিবার (৩০ অক্টোবর ১৯৭৫) সাবেক প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত বাসভবনে পাওয়া গিয়াছে এই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের বরাতে বলা হয়, শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে ৭ লাখ ৮০ হাজার টাকা মূল্যের হীরা, মুক্তা, প্লাটিনাম ও স্বর্ণালংকার উদ্ধার করা হয়।
পাশাপাশি প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টাকা সমমূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা, বিদেশি রাষ্ট্রের দেয়া প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের উপহার এবং তিনটি ব্যক্তিগত গাড়ির তথ্যও উঠে আসে সেই প্রতিবেদনে। এমনকি শেখ মুজিব, তাঁর স্ত্রী, সন্তান ও পুত্রবধূদের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে থাকা ২২টি হিসাবের বিপরীতে প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার টাকা উদ্ধারের তথ্যও পাওয়া যায় সূত্র থেকে। শুধু তা-ই নয়, বাড়ি থেকে বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ পাওয়া গিয়েছিল বলেও তথ্য রয়েছে।
শেখ হাসিনার ফেরত দেয়া সম্পদ ও অন্যান্য দাবি
তবে এখানেই শেষ নয়। তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে আসে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। বিভিন্ন গণমাধ্যমের সূত্রে জানা যায়, শেখ হাসিনা দেশে ফিরে আসার পর ৫০৩ ভরি স্বর্ণালংকার, ৪০৫৪ ভরি রুপার অলংকার ও সামগ্রী এবং নগদ এক লাখ ৫৮ হাজার ২৩৯ টাকা ফেরত দেয়া হয়। এ ছাড়া শেখ মুজিবকে হত্যার পর তাঁর বাসভবন থেকে ২৯ লাখ, মতান্তরে ২৫ লাখ টাকা পাওয়া যায় বলেও দাবি করা হয় বিভিন্ন সূত্রে।
ধানমন্ডি ৩২ বাড়ি কেনার প্রশ্ন
অপরদিকে, বাকশাল কায়েম করতে চাওয়া এই শাসকের ধানমন্ডি ৩২-এর ব্যক্তিগত বাসভবন নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। সমালোচনা রয়েছে, সে সময়ে ধানমন্ডিতে বাড়ি নির্মাণের সামর্থ্য ছিল কেবল উচ্চবিত্তদের। অথচ সেই বিলাসবহুল এলাকাতেই ১৯৫৭ সালে এক বিঘা জমি নিজের স্ত্রী বেগম ফজিলাতুন্নেছার নামে কেনেন শেখ মুজিব। সূত্রের দাবি, সে সময় শেখ মুজিবুর রহমানের উল্লেখযোগ্য কোনো আয়ও ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, স্বৈরশাসক হিসেবে পরিচিত শেখ মুজিবের এই সম্পদের পাহাড় কীভাবে গড়ে উঠেছিল? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে ১৯৬০ সালে।
আইয়ুব আমলের মামলা
তথ্য বলছে, ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক আইন জারির পর আইয়ুব খানের সামরিক সরকার শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে ৯টি মামলা দায়ের করেছিল। ওই মামলায় ১৯৬০ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ আদালত তাঁকে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন।
১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ
অন্যদিকে, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর শেখ মুজিবের শাসনামল নিয়েও সৃষ্টি হয় নানা বিতর্ক। ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয়গুলোর একটি ছিল ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। সূত্র জানায়, খাদ্যের অভাবে সে সময় লাখ লাখ মানুষ মারা যায়। স্বাধীনতার পর যে দেশের মানুষের চোখে ছিল নতুন স্বপ্ন, সেই দেশেই খাদ্যের অভাবে মানুষের জীবন প্রদীপ নিভে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমের এক সাংবাদিক মানুষ ঘাসপাতা খেয়ে বেঁচে আছে এমন বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে শেখ মুজিবকে প্রশ্ন করলে, কোন কোন জায়গায় এমনটা হতে পারে, সব জায়গায় না এমন কথা বলে বিষয়টিকে উড়িয়ে দেন মুজিব।
অভিযোগ রয়েছে, দেশের এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতিতেও লাখ লাখ টন খাদ্য নির্বিঘ্নে পাচার হয়ে যায় সীমান্তের দাদাবাবুদের কাছে। এ সময় লোকদেখানো বক্তব্য দিলেও পাচার রোধে কার্যকর কোনো প্রতিকার করেননি মুজিব এমন অভিযোগও রয়েছে।
মানুষ যখন ক্ষুধার তাড়নায় দিশেহারা, ঠিক তখনই সোনার মুকুট মাথায় পরিয়ে ছেলেদের বিয়ের আয়োজন করেন শেখ মুজিব তাঁকে ঘিরে এমন সমালোচনাও রয়েছে। একদিকে ক্ষুধার্ত মানুষের হাহাকার, অন্যদিকে রাজকীয় আয়োজন এই বৈপরীত্যই শেখ মুজিবকে দাঁড় করায় ইতিহাসের কাঠগড়ায়।
রক্ষীবাহিনী ও একদলীয় শাসন
শেখ মুজিবকে ঘিরে বিতর্কের আরেকটি বড় অধ্যায় ছিল মুক্তিযুদ্ধের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে গঠিত রক্ষীবাহিনী। তবে গঠনের কিছুদিনের মধ্যেই এই বাহিনীর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগে ফুঁসে ওঠে দেশবাসী।
এরপর ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংসদীয় পদ্ধতির পরিবর্তে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা চালু করেন এই স্বৈরশাসক। একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি গঠিত হয় বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বাকশাল। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হিসেবে জাতীয় ঐক্য ও প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হলেও বাস্তবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ হরণ করা হয়।
একইভাবে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সংকুচিত হয় সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন সংবাদপত্রের ঘোষণাপত্র বাতিলের মাধ্যমে অধিকাংশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়। ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, সেসময় ২৯টি দৈনিক এবং ১৩৮টি সাপ্তাহিক ও সাময়িকীর প্রকাশনা বন্ধ হয়; চালু রাখার অনুমতি পায় মাত্র চারটি পত্রিকা।
সব মিলিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলকে ঘিরে ইতিহাসের পাতায় উঠে আসে নানা অপ্রাপ্তি, অভিযোগ ও অস্বস্তিকর অধ্যায়। দুর্নীতি, দীর্ঘ দুর্ভিক্ষ, রক্ষীবাহিনীর দমন-পীড়ন এবং একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা। যে শাসনামলকে ঘিরে আজও প্রশ্নের শেষ নেই, সেই শাসনের পরিণতিও ছিল ভয়াবহ। শেষ পর্যন্ত শেখ মুজিব ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ইতিহাসের অন্যতম নির্মম পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়।
আরও পড়ুন:







