রবিবার

৮ নভেম্বর, ২০২৬ ২৪ কার্তিক, ১৪৩৩

বিএসটিআইয়ে ঝুঁকিভাতার নামে বছরে ব্যয় ১০০ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৮ নভেম্বর, ২০২৬ ১১:১৮

শেয়ার

বিএসটিআইয়ে ঝুঁকিভাতার নামে বছরে ব্যয় ১০০ কোটি টাকা
ছবি সংগৃহীত

মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) ৬০৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সবাই পাচ্ছেন ঝুঁকিভাতা। এ খাতে বছরে ব্যয় হচ্ছে সংস্থাটির আয়ের প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত এক দশকে ঝুঁকিভাতার নামে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গঠিত প্রাতিষ্ঠানিক টিমের অনুসন্ধানে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে ঝুঁকিভাতা বিতরণের পাশাপাশি বিএসটিআইয়ের আর্থিক অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নে দুর্নীতি এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি ১৭ দফা সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠিয়েছে দুদক।

আয়ের অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ

সূত্র জানায়, চলতি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে বিএসটিআইয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের দুর্নীতির উৎস, কারণ ও প্রতিরোধের উপায় অনুসন্ধান করে দুদকের গঠিত টিম কমিশনের কাছে ১৭টি সুপারিশ জমা দেয়। এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়ার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি অবহিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। পরে দুদকের সচিব সাইদুর রহমান খানের স্বাক্ষরে সুপারিশগুলো মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন। বিএসটিআইয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের আয়ের একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার বিধান থাকলেও তা জমা দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিষ্ঠানের আয় ও উদ্বৃত্ত অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিভাতা ও অন্যান্য সুবিধা দিতে ব্যয় করা হচ্ছে। এতে আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিএসটিআই আইন, ২০১৮ অনুযায়ী, সংস্থাটির আয় ও উদ্বৃত্ত অর্থ ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত আইনি বিধান অনুসরণ করতে হবে। কিন্তু বিএসটিআইয়ের আয়কে বেসরকারি অর্থ হিসেবে বিবেচনা করে এর একটি অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে বণ্টন করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থ বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী, বিএসটিআইয়ের কোনো আয়কে বেসরকারি আয় হিসেবে গণ্য করার সুযোগ নেই।

এ বিষয়ে একাধিকবার অডিট আপত্তিও এসেছে। আপত্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানের আয়ের ৪০ শতাংশ বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বিএসটিআই কাউন্সিলের নেই। পণ্যের মান সনদ ও লাইসেন্স প্রদান কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক দায়িত্বের অংশ হওয়ায় এ খাত থেকে অর্জিত অর্থ প্রতিষ্ঠানের সরকারি আয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। তারপরও প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণয়ন না করে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মের দোহাই দিয়ে অর্থ বণ্টন অব্যাহত রাখা হয়েছে।

২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমান ঝুঁকিভাতা

বিএসটিআইয়ে মোট জনবল ৬০৮। দুদকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁদের সবাই ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন। জনপ্রতি বছরে এ ভাতার পরিমাণ ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমান। মাসে গড়ে একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রায় ৬০ হাজার টাকা করে পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে বছরে এ খাতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১০০ কোটি টাকা। সে হিসাবে গত এক দশকে ঝুঁকিভাতা দেওয়া হয়েছে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের মনিটরিং সেল ২০২২ সালের ৫ জুন বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনের বাইরে অতিরিক্ত ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ঝুঁকিভাতা দেওয়া বন্ধের নির্দেশনা দেয়। ওই নির্দেশনার বিরুদ্ধে বিএসটিআইয়ের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মো. তুহিন আহমেদ ২০২২ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দেশনার কার্যকারিতা স্থগিত হলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিভাতা গ্রহণ অব্যাহত থাকে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিএসটিআইয়ের ৬০৮টি পদের গ্রেডভিত্তিক হিসাবও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেড-৪-এ ছয়টি, গ্রেড-৬-এ ৫১টি, গ্রেড-৯ ও তদূর্ধ্বে ৩৭৫টি, গ্রেড-১০ ও ১১-তে নয়টি, গ্রেড-১২ থেকে ১৬-তে ১০৭টি এবং গ্রেড-১৭ থেকে ২০-এ ৫৯টি পদ রয়েছে। এসব পদের বিপরীতে কর্মরত সবাই ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন।

আইন হওয়ার আট বছরেও হয়নি বিধিমালা

বিএসটিআই আইন, ২০১৮-এর ৪১ ধারায় প্রতিষ্ঠানের তহবিল গঠন, অর্থের উৎস, তফসিলি ব্যাংকে অর্থ জমা এবং বিধি অনুযায়ী তহবিল পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। তবে আইন প্রণয়নের প্রায় আট বছর পরও এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় বিধিমালা তৈরি হয়নি।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিধিমালা না থাকার সুযোগে ঝুঁকিভাতা, পেনশনভাতা ও কল্যাণভাতাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। এসব ব্যয়ের যৌক্তিকতা ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে অডিট আপত্তি রয়েছে। পৃথক বেনেভোলেন্ট তহবিল থাকা সত্ত্বেও কল্যাণমূলক কাজে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যয়ের বিষয়েও প্রশ্ন তুলেছে দুদক।

প্রকল্পের কাজে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

বিএসটিআইয়ের বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে সরকারি বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের একাধিক আপত্তির বিষয়ও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি ক্রয়বিধি লঙ্ঘন করে দরপত্র মূল্যায়ন, নন-রেসপনসিভ ঠিকাদারকে রেসপনসিভ হিসেবে বিবেচনা করে চুক্তি সম্পাদন এবং প্রকল্পের অর্থ ব্যয়ে অনিয়ম।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ের প্রশাসন ভবনের চতুর্থ তলার ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ কাজে ১ কোটি ৫১ লাখ ৭৫ হাজার ৫৮৬ টাকার অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। একই তলার ডেকোরেশন কাজে ফলস সিলিং স্থাপন না করেই ৫ লাখ ৫৩ হাজার ৭২৮ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। এ ছাড়া নকশা ও কার্যাদেশবহির্ভূত কাজে ১৯ লাখ ১১ হাজার ১৯৭ টাকা বিল দেওয়ার বিষয়টিও অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাঁচ জেলায় বিএসটিআইয়ের সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পের ২ কোটি ২০ লাখ ৭ হাজার ২০০ টাকার কেনাকাটায় অনিয়ম এবং ঠিকাদারের কাছ থেকে ২ লাখ ৬৯ হাজার ১৬১ টাকা লিকুইডেটেড ড্যামেজেস (এলডি) আদায় না করার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া মহাপরিচালকের (ডিজি) অবসরভাতার নামে অনিয়মিতভাবে অর্থ গ্রহণের বিষয়টি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে অর্থ ফেরত নেওয়ার দাবি টিআইবির

বিএসটিআইয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঝুঁকিভাতার নামে বছরে ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ অর্থ গ্রহণ এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বছরে শতকোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ সঠিক হলে তা ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণের অর্থ আত্মসাতের শামিল বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তিনি বলেন, এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। নিয়মবহির্ভূতভাবে ভোগ করা অর্থ বাধ্যতামূলকভাবে ফেরত নেওয়ার পাশাপাশি দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাসসহ ১৭ সুপারিশ

বিএসটিআইয়ের জাল সিল ব্যবহার করে নিম্নমানের ও ভেজাল পণ্য বাজারজাত করার অভিযোগও দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে সংস্থাটি ১৭ হাজার ৮৯৭টি খাদ্যপণ্যসহ মোট ২৭ হাজার ৫৭টি নমুনা পরীক্ষা করেছে। তবে বাধ্যতামূলক লাইসেন্সের আওতার বাইরে থাকা অনেক পণ্য যথাযথ তদারকির বাইরে রয়েছে।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় লাইসেন্সের আওতা বাড়ানো, গোয়েন্দা নজরদারি, বিশেষ অভিযান, কারখানা পরিদর্শন এবং বাজার থেকে নমুনা সংগ্রহ জোরদারের সুপারিশ করেছে দুদক।

প্রতিবেদনে বিএসটিআই, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তির কারণে অর্থ ও জনবলের অপচয় হচ্ছে বলে মনে করছে দুদক। এ জন্য সংস্থাগুলোর দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করা, সমন্বিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা এবং আধুনিক কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগার স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

লাইসেন্স ও নমুনা অনুমোদন পেতে উদ্যোক্তাদের হয়রানি বন্ধে কর্মকর্তাদের রোটেশন পদ্ধতিতে দায়িত্ব প্রদান, কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স ও অভ্যন্তরীণ নজরদারি জোরদারের সুপারিশও করা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের ৮৪২টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪৭৬টি নবম গ্রেড ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ের। এ অবস্থায় জনবল কাঠামো পুনর্বিন্যাস, মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো এবং পরীক্ষাগার আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরামর্শ দিয়েছে দুদক। পাশাপাশি আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, অডিট আপত্তি নিষ্পত্তি ও প্রশাসনিক জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।

বিএসটিআইয়ের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান বলেন, বিষয়টি তিনি এখনো জানেন না। জেনে পরে জানাতে পারবেন।

অন্যদিকে, বেতনের বাইরে বছরে ২৫ থেকে ২৭ মাসের মূল বেতনের সমপরিমাণ ঝুঁকিভাতা গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। এর একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট রয়েছে। যেভাবে বিষয়টি তুলে ধরা হচ্ছে, বাস্তবতা ঠিক তেমন নয়। তবে বিষয়টি নতুনও নয়।