পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য বিজয়ের মাসকে রক্তাক্ত করা
ডিসেম্বরের দ্বারপ্রান্তে বিষাক্ত বাতাস
ডিসেম্বর মাস যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, যখন একান্ন বছরের ঐতিহ্য আর চব্বিশের নতুন সূর্যমুখীর ঘ্রাণে বাতাসে ভেসে আসে বিজয়ের অবিরল সুবাস, ঠিক তখনই কাটাতারের বেড়া পেরিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে উড়ে আসছে যেন ষড়যন্ত্রের বিষাক্ত বাতাস।
চব্বিশের রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার উত্তাল তরঙ্গের মুখে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। দিল্লির প্রচ্ছায়ায় তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর সেই দহন কি তারা মেনে নিতে পেরেছে?
বিশেষজ্ঞ মত হলো, না। অভিযোগ উঠেছে, শান্ত জল ঘোলা করতে উত্তরপূর্ব ভারতের বিশেষ গোয়েন্দা সেলের সুনির্দিষ্ট ছক আর ওপার বাংলার প্রকাশ্য-প্রচ্ছন্ন মদদে এখন সাজানো হচ্ছে চব্বিশোত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নাশকতার ব্লু-প্রিন্ট।
পতনের অন্তিম মুহূর্তে ভিন্ন সমীকরণ
চব্বিশের উত্তাল জুলাই-আগস্টে যখন ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছিল, তখন এই ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
জনগণের রোষানল থেকে বাঁচতে যখন ফ্যাসিস্ট হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে যান, ঠিক সেই অন্তিম মুহূর্তেও নেপথ্যে কাজ করেছিল এক ভিন্ন সমীকরণ।
তারা সমতলে আর প্রকাশ্য মাঠে দাঁড়াতে সাহস পায় না। তাই শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ আর এসি রুমের নরম বিছানায় বসে চলছে ঘুঁটি চালার খেলা। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকার কোনো এক বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে চায়ের কাপে ধোঁয়া তুলে ফ্যাসিস্টের দোসররা ছক কষছে কীভাবে অর্থনীতিকে পঙ্গু করা যায়, কীভাবে দেশকে আবার অস্থিতিশীল করা যায়।
শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনকে হাতিয়ার
এই ষড়যন্ত্রের ডালপালা ছড়ানো হয়েছে দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র শিল্পাঞ্চলে। সাম্প্রতিক সময়ে চলমান শ্রমিক আন্দোলনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর ও সুদূরপ্রসারী এক অস্থিতিশীলতা। সাধারণ ও খেটে খাওয়া শ্রমিকদের ন্যায়সঙ্গত দাবি বা না পাওয়ার বেদনাকে হাতিয়ার বানিয়ে এর ভেতরে সুপরিকল্পিতভাবে অনুপ্রবেশ করেছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও ক্যাডার বাহিনী।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের প্রত্যক্ষ অর্থায়ন ও হুন্ডির টাকায় এই আন্দোলনকে সহিংস করে তোলার অপচেষ্টা চলছে। কলকারখানায় হামলা, ভাঙচুর এবং অর্থনীতিকে একেবারে অচল করে দেয়ার এই এজেন্ডার পেছনে কলকাঠি নাড়ছে সেই পতিত ফ্যাসিস্ট চক্রই। শ্রমিকদের আবেগ নিয়ে খেলে দেশকে অস্থিতিশীল করা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যস্ত রাখার এই গভীর খেলায় ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছে আওয়ামী ও সহযোগী সংগঠনের ডজন ডজন নাশকতামূলক কর্মী।
সাজেককে রক্তাক্ত করার নীল নকশা
এই ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায়টি রচিত হচ্ছে পাহাড়ের চূড়ায়। নৈসর্গিক রূপসী সাজেক ভ্যালি। যেখানে মেঘের সাথে মিতালি করে হাজারো দেশি-বিদেশি পর্যটক। কেন হঠাৎ সেই সাজেককে রক্তাক্ত করার নীল নকশা তৈরি হলো? কেন পাহাড়ি জনপদকে অস্থিতিশীল করে তোলা হলো? চারদিকে ঘুরছে এমনসব প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞরা বলছে, এটি কোনো সাধারণ জাতিগত বা পাহাড়ি সংঘাত নয়। ভারত ও হাসিনা চক্রের যৌথ মাস্টারপ্ল্যানের এটি এক সুদূরপ্রসারী অংশ। মূল উদ্দেশ্য একটাই, সমতলের নজর ঘুরিয়ে দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামকে এক অস্থিতিশীল রণাঙ্গনে রূপান্তর করা। আর এই ষড়যন্ত্রের মূলে রয়েছে সরাসরি চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে ওপার থেকে অস্ত্র ও অর্থের যোগান।
তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজর কাড়তে এক নিদারুণ-নিষ্ঠুর খেলা খেলেছে এই চক্রটি। বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সাজেকে বন্দুকযুদ্ধের কৃত্রিম পরিবেশ তৈরি করে, সশস্ত্র ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে প্রায় তিন হাজার পর্যটককে জিম্মি বা চরম আতঙ্কের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল পরিষ্কার, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রধান শিরোনামে বাংলাদেশকে এক ব্যর্থ রাষ্ট্র বা অস্থিতিশীল জনপদ হিসেবে তুলে ধরা।
এছাড়া, যেন বিশ্ববাসীর চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো যায়, চব্বিশের পরিবর্তনের পরও বাংলাদেশ অশান্ত। পার্শ্ববর্তী দেশের গোয়েন্দা প্ররোচনায় সাজেককে ঘিরে এই ভূ-রাজনীতির নোংরা খেলা বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার এক সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্র ছাড়া আর কিছু নয় বলেই মনে করছে সচেতন মহল।
গোপালগঞ্জ ও ঢাকায় নাশকতার মহড়া
ঠিক একই সময়ে, সমতলে শুরু হয়েছে সুনির্দিষ্ট নাশকতার মহড়া। শনিবার (২৪ অক্টোবর) গোপালগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে।
এছাড়াও, রাজধানীতে বিগত এক মাসে ধারাবাহিক ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে। মিরপুর-১১, শেরেবাংলা নগর, কুর্মিটোলা, রামপুরা ও ধানমন্ডিসহ বেশ কয়েকটি স্পর্শকাতর এলাকায় দুর্বৃত্তরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এতে সাধারণ পরিবহন চালক, পথচারী ও টহলরত পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে।
এছাড়াও চোখে পড়েছে, টহল গাড়িতে নির্বিচারে ইট-পাটকেল ও ককটেল নিক্ষেপ, দেশের বিভিন্ন অলিগলিতে রাতের আঁধারে ঝটিকা মিছিল, হাতবোমা বিস্ফোরণ, এবং হঠাৎ করে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করার তীব্র উৎসব। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এসব কি কেবলই ছোটখাটো ঘটনা?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছে, এসব আসন্ন ডিসেম্বরের বিজয়ের মাসকে রক্তাক্ত করার সুপরিকল্পিত মহড়া। ডিসেম্বরেই ফিরছেন নেত্রী, এমন কাল্পনিক গুঞ্জন তুলে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতাকর্মীরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাঠে নেমে একযোগে ধ্বংসাত্মক তাণ্ডব চালানোর অপচেষ্টা করছে।
টকশো থেকে সাইবার যুদ্ধ
একইভাবে সমালোচনা রয়েছে, মুখে তারা গণতন্ত্রের বুলি আউড়ায়, অথচ সুশীল সমাজের লেবাস পরে গণমাধ্যমের টকশো থেকে শুরু করে বিভিন্ন সভা-সেমিনারে তারা সূক্ষ্মভাবে ডিফেন্ড করছে ফ্যাসিবাদকে।
শুধু এসি রুম বা টকশো নয়, সাইবার দুনিয়াতেও এখন চলছে সর্বাত্মক যুদ্ধ। তথ্য রয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা ঢালা হচ্ছে প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভুয়া অডিও-ভিডিও তৈরি, গুজব আর অপপ্রচারের মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত করার এই অপচেষ্টা এখন যেন ওপেন সিক্রেট।
ইতিহাসের শিক্ষা ও ছাত্র-জনতার প্রত্যয়
ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, ষড়যন্ত্রকারীরা কখনোই আলোর সামনে দাঁড়াতে পারে না, তারা সবসময় অন্ধকারের সুযোগ নেয়। একাত্তরেও রক্ত ঝরেছিল, চব্বিশেও রাজপথ ভিজেছে তাজা রক্তে। নতুন বাংলাদেশ কখনোই কোনো পরাশক্তি বা ফ্যাসিস্টের রক্তচক্ষু মেনে নিবে না, এমন দাবি সবসময়ই করে আসছে ছাত্র-জনতা।
পাহাড় থেকে সমতল, শিল্পাঞ্চলের রাজপথ থেকে সাইবার স্পেস, সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে সীমান্তের ওপার থেকে বুনে দেয়া প্রতিটি বিষবৃক্ষের শেকড়। আর তা টেনেহিঁচড়ে উপড়ে ফেলতে প্রস্তুত এ দেশের আপামর ছাত্র-জনতা। ডিপ স্টেইটের নীল নকশা থামিয়ে দেয়া কিংবা এসি রুমের চক্রান্ত আর ফ্যাসিস্টের দোসরদের রুখে দেয়ার পাশাপাশি শাস্তির দাবি সবার।
আরও পড়ুন:







