বৃহস্পতিবার

৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২১ কার্তিক, ১৪৩৩

‘স্যরি’ ঘিরে প্রথম আলো-আ. লীগ ‘মিলেমিশে একাকার’

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২১:০০

শেয়ার

‘স্যরি’ ঘিরে প্রথম আলো-আ. লীগ ‘মিলেমিশে একাকার’
ছবি সংগৃহীত

স্যরি! ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু প্রথম আলোর এই স্যরি শব্দটিই যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খুলে দিয়েছে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের এক নতুন দুয়ার। সেই সঙ্গে সামনে এসেছে নানা প্রশ্ন। সত্যিই কি শুধু সরি বললেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়? নাকি একটি শব্দের আড়ালে ঢাকা পড়ে যায় দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, অসন্তোষ আর নানা প্রশ্ন?

শুধু তাই নয়, প্রথম আলোর এই সরিকে ঘিরে ফেসবুকে চোখে পড়েছে একটি হাস্যরসাত্মক গানও। যেখানে প্রথম আলোর এই ক্ষমা চাওয়ার বিষয়টিকে পরোক্ষভাবে বিদ্রূপ করা হয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।

মতিউর রহমানের স্যরি লেখা প্রকাশ

বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রথম আলোর ২৮ বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্পাদক মতিউর রহমানের লেখা স্যরি, সবাইকে খুশি করতে পারিনি শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। এতে স্যরি বলার পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সব বিষয়ে একমত হতে না পারা, অনিয়মের বিরুদ্ধে নীরব না থাকা এবং শত আঘাতেও থেমে না যাওয়ার মতো বিষয় তুলে ধরেছেন তিনি। তবে তাঁর এই লেখনিতে বিরোধী মতাদর্শের মানুষদের অনেকটা খোঁচা দিয়ে কথা বলা হয়েছে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

এদিকে, স্যরি সবাইকে খুশি করতে পারিনি শিরোনামে প্রথম আলোতে মতিউর রহমানের লেখাটি প্রকাশের পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা-সমালোচনার ঝড়। সেই সঙ্গে ফটোকার্ডের মন্তব্যের ঘরে দেখা যায় নেটিজেনদের হাস্যরস, ব্যঙ্গ আর সমালোচনার রোল। যেন একটি ছোট্ট শব্দকে কেন্দ্র করেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জমে উঠেছে কটাক্ষের এক নতুন আসর।

নেটিজেনদের মন্তব্যে ব্যঙ্গ ও রসিকতা

মতিউর রহমানের এই ফটোকার্ডের নিচে উঠে এসেছে কিছু চোখে পড়ার মতো মন্তব্য। সফিক মামুন নামের এক ব্যক্তির দাবি, সবাইকে খুশি করতে না পারলেও মতি ভারতকে খুশি করতে পেরেছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। সেই সঙ্গে শাহাদাত হোসেন নামের এক ব্যক্তি লেখেন, দাদাদের খুশি করতে পারাটাই প্রথম আলোর জন্য যথেষ্ট। অন্যদিকে, দ্বিতীয় পৃষ্ঠা নামের একটি আইডি থেকেও প্রথম আলোর সম্পাদককে কটাক্ষ করে বলা হয়, মতির গতি ভালো না, তাই সরি।

শুধু তাই নয়, সরি দিয়ে প্রথম আলোর অফিসিয়াল পেজ থেকে করা পোস্ট নিয়েও মন্তব্যের ঘরে নেটিজেনদের নানা রসিকতা ও বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য দেখা যায়। আলী আহসান মুজাহিদ নামের এক ব্যক্তি বিদ্রূপ করে সরি পরে বলে আগে ভিডিও আপলোড দেওয়ার কথা লিখে। সত্য কথন সত্য কথন নামের এক আইডি থেকেও কটাক্ষ করে লেখা হয়, কুকুরের লেজ কখনও সোজা হয় না। অন্যদিকে, মোহাম্মদ আফরিন নামের এক ব্যক্তিও অভিনেত্রী পরীমনি ও মেহজাবিনকে সতর্ক করার মাধ্যমে প্রথম আলোর এই সরি পোস্টকে বিদ্রূপ করেছেন।

সমর্থকদের প্রচার ও বিতর্কিত সমর্থন

অপরদিকে, প্রথম আলোর এই স্যরি নিজেদের ফেসবুকে শেয়ার করে প্রচার করতেও দেখা যায় প্রথম আলো সমর্থক অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তাঁদের নিয়েও জন্ম নেয় নানা আলোচনা-সমালোচনা।

একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সমালোচিত সাংবাদিক আনিস আলমগীর এবং বিতর্কিত রাজনীতিবিদ গোলাম মাওলা রনিকেও প্রথম আলোর সরির সমর্থনে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিতে দেখা যায়। এমনকি প্রথম আলোর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকেও রনিকে সরি বলে উত্তর দেওয়ার চিত্রও উঠে আসে।

তারকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিতর্কিত সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদ—প্রথম আলোর সমর্থনে সরি নিয়ে একের পর এক পোস্ট সামনে আসছে। আর এসব পোস্ট ঘিরেই উঠছে নতুন প্রশ্ন। এ কি কেবলই সমর্থন, নাকি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রথম আলোকে নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, সেটিকে আড়াল করার একটি অপকৌশল মাত্র?

আওয়ামী লীগের পোস্ট ও মুফতি হারুনের সমালোচনা

প্রথম আলোর এই স্যরি শব্দটি নিয়ে পোস্ট করতে বাদ যায়নি নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগও। বুধবার (৪ নভেম্বর) নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে স্যরি লিখে একটি বিতর্কিত পোস্ট করা হয়। যেখানে তারেক রহমানকে ব্যঙ্গ করে কটূক্তি করতে দেখা যায়।

অন্যদিকে, প্রথম আলোর এই স্যরি নিয়ে সমালোচনামূলক পোস্ট করেন দেশের অন্যতম ইসলামিক স্কলার মুফতি হারুন ইজহার। তাঁর পোস্টে প্রথম আলোকে নিয়ে বিদ্রূপের পাশাপাশি তাদের ন্যারেটিভ এবং বিদেশি এজেন্ডা বাস্তবায়নে ফ্যাসিবাদী আমলে প্রথম আলোর অপচেষ্টার প্রতি প্রত্যক্ষ ইঙ্গিত রয়েছে।

এর আগে বাংলা এডিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুফতি হারুন ইজহারের বক্তব্যেও উঠে এসেছিল দেশে প্রথম আলোর জঙ্গি নাটক সাজানোর ন্যারেটিভের প্রসঙ্গ।

একটি সরি থেকে শুরু, এরপর ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ, আর বিতর্কিত রাজনৈতিক সমর্থন —সব মিলিয়ে প্রথম আলোর ২৮ বছর পূর্তির এই বার্তা যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে পুরোনো ক্ষোভ ও অসংখ্য প্রশ্ন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, একটি ক্ষমা প্রার্থনা কি দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষ মুছে দিতে পারে? নাকি সেই অসন্তোষের গভীরতা বুঝতে হলে শুধু সরি বললেই চলবে না, দিতে হবে প্রশ্নগুলোরও জবাব?