দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক থেকে শুরু করে টেলিভিশন চ্যানেলের চেয়ারম্যান, বহু পদধারী এক সাংবাদিক। ক্ষমতার পালাবদলে রঙ বদলানোর শিল্পে তিনি যেন এক সিদ্ধহস্ত চরিত্র। তিনি ফ্যাসিবাদের দোসরখ্যাত ও স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক তথ্য উপদেষ্টা সাংবাদিক ইকবাল সোবহান চৌধুরী।
অবশেষে, গোয়েন্দা পুলিশ তাকে আটক করেছে। বুধবার (৪ নভেম্বর) রাজধানীর মহাখালী থেকে আটকের পর, ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে মিন্টু রোডের ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। পরে, জুলাই হত্যা মামলায় ইকবাল সোবহানকে কারাগারে নেওয়া হয়।
এর আগে, গত ১৫ এপ্রিল হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সৌদি ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছিল তাকে।
অভিযোগ
অভিযোগ অনুযায়ী, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে তৈলমর্দন করে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের নিয়ন্ত্রণের নেপথ্য কারিগর ছিলেন এই ইকবাল সোবহান। তদবির এবং কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়।
২৪ এর জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে প্রশাসন ও সরকারকে সরাসরি গণহত্যায় ইন্ধন জুগিয়েছেন এই সাংবাদিক।
উন্নয়নের বুলি আওড়িয়ে ছাত্র-জনতার বুকে গুলি চালানোর নির্দেশদাতা এই ব্যক্তিই আবার ভোল পাল্টে ছবি তুলে বেড়িয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে।
যে জামায়াতকে তিনি অতীতে ঘাতক, যুদ্ধাপরাধী এবং ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলার জন্য দায়ী করে নানা মনগড়া তকমা দিয়েছিলেন, ক্ষমতার টানে তাদের সাথেই সখ্য গড়ার অপচেষ্টা করেছেন তিনি।
শুধু তাই নয়, ৩২ হাজার কোটি টাকার পদ্মাসেতুর দুর্নীতি আড়াল করে, তৎকালীন সরকারের অন্ধ প্রশংসা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৫৭ ধারার পক্ষে সাফাই গাওয়াও ছিল তার অন্যতম রুটিন কাজ।
কিংবা, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও তৎকালীন বিরোধী দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে মিথ্যাচার করতেও ছাড়েননি ইকবাল সোবহান।
বিএনপি-জামায়াতসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নামে বিভিন্ন বদনাম করে বেড়ালেও ইকবাল সোবহানের কাছে সবসময় প্রশংসিত হয়েছে আওয়ামী লীগ, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম স্বৈরাচার হিসেবে পরিচিত শেখ মুজিব ও তার পরিবার।
বিগত দিনে দেশের সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও সুবিধা অর্জনের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের প্রশংসায় লিপ্ত ছিলেন ইকবাল সোবহান চৌধুরী। অভিযোগ রয়েছে, ব্যক্তিগত স্বার্থে জনবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ব্যক্তিদের নিয়মিত সমর্থন দিয়ে গেছেন তিনি।
বুয়েটের, একসময়ের মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে পর্যন্ত ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি এই ইকবাল সোবহান।
তাঁর এই, নানা বৈচিত্রময় চরিত্র নিয়ে খোদ আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমানও অতীতে সংসদে প্রশ্ন তুলেছিলেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া
এদিকে, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে আটকের পর, তাকে ছাড়িয়ে আনতে একটি প্রভাবশালী মহল তৎপর হয়ে উঠেছে বলে, অভিযোগ করে একটি পোস্ট করেছেন।
অন্যদিকে, সাংবাদিক ডক্টর কনক সরওয়ার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে, ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রীর সাবেক তথ্য উপদেষ্টা ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।
ফেসবুক পোস্টে কনক সরওয়ার দাবি করেন, ইকবাল সোবহান চৌধুরী তদবির ও কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ অর্জন করেছেন। পাশাপাশি সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেওয়ার বিনিময়ে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার পদ লাভ করেছিলেন বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। পোস্টে ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করে কনক সরওয়ার আরও বলেন, বয়স বা শারীরিক অসুস্থতার মতো অজুহাত দেখিয়ে যেন তাকে কোনো সহানুভূতি বা সুবিধা দেওয়া না হয়।
গণহত্যার দায়ে যদি আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হতে পারে, তবে গণহত্যার হুকুমদাতা ও স্বৈরাচারের দোসরখ্যাত ইকবাল সোবহানের মতো সাংবাদিকরূপী দুর্বৃত্তদেরও শাস্তির আওতায় উচিত বলে মনে করে, সচেতন মহল।
আরও পড়ুন:







