বৃহস্পতিবার

৫ নভেম্বর, ২০২৬ ২১ কার্তিক, ১৪৩৩

মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয়, বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর, ২০২৬ ১১:১৯

শেয়ার

মার্কিন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের জয়, বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ
ছবি সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় এবং কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ দলটির হাতে যাওয়ায় দেশটির অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশের ওপরও। নতুন পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে ঢাকার সামনে।

বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দল ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—উভয় পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ।

বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ

নির্বাচনের ফলাফলে কংগ্রেসে প্রশাসনের ওপর নজরদারি ও জবাবদিহির চাপ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পক্ষে কংগ্রেসের যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়াই অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করা কঠিন হতে পারে।

ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য, পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতির অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকা দেশগুলোর জন্য কংগ্রেসের ক্ষমতার এই পরিবর্তন কিছুটা স্বস্তির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এই পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হচ্ছে না। নতুন নির্বাচিত আইনপ্রণেতারা আগামী জানুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার আগ পর্যন্ত কংগ্রেসের উভয় কক্ষে রিপাবলিকানদের বর্তমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা বহাল থাকবে। ফলে আরও দুই মাস নিজেদের কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে ট্রাম্প প্রশাসন।

কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান উভয় দলের নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা উচিত বাংলাদেশের। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সই করা পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে আলোচনা বাড়ানো জরুরি।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ বলেন, বাংলাদেশের উচিত দুই দলের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ক্ষমতাসীন দলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে উভয় দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

তিনি বলেন, আমরা পারস্পরিক শুল্ক চুক্তিতে সই করেছি। এখন বাংলাদেশ ডেমোক্র্যাট নেতাদের কাছে ব্যাখ্যা করতে পারে, কেন চুক্তিটি অন্যায্য। একই সঙ্গে তাঁদের চুক্তিটির পক্ষে সমর্থন না দেওয়ার আহ্বান জানাতে পারে।

সালেহ মনে করেন, ডেমোক্র্যাটদের বিজয় চুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে দলীয় সীমারেখার বাইরে রাজনৈতিক যোগাযোগ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। কারণ, আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট পার্টি আবারও হোয়াইট হাউসে ফিরতে পারে।

তাই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক যোগাযোগের কৌশল নতুন করে পর্যালোচনা এবং বাংলাদেশের প্রতি মার্কিন নীতিনির্ধারণে প্রভাব রাখতে পারেন—এমন আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ এনে দিয়েছে।

প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটে ট্রাম্পের নীতির প্রভাব

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরাও এবারের নির্বাচনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।

২৫ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি-আমেরিকান মোহাম্মদ শামীম বলেন, আগের মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার প্রবাসী ভোটারদের মধ্যে ভোট দেওয়ার আগ্রহ ও উৎসাহ বেশি দেখা গেছে।

ভোটারদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে তিনি অর্থনৈতিক দুরবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসননীতিকে তিনটি প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।

তাঁর মতে, ইরান যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। এতে সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের ওপর আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।

শামীমের দাবি, বাংলাদেশিসহ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোটারদের বড় একটি অংশ মনে করেন, ট্রাম্প যেভাবে দেশ পরিচালনা করছেন, তা গণতন্ত্রের জন্য হুমকি। এ কারণেই ভোটাররা তাঁর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে না ভোট দিয়েছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর বাড়বে কংগ্রেসের নজরদারি

ওয়াশিংটনের বাইরেও ডেমোক্র্যাটদের এই বিজয়ের প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে যেসব দেশ ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্র ও অর্থনৈতিক নীতির কারণে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছিল, তাদের জন্য নতুন পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

শুল্ক, বাণিজ্য, অভিবাসন এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা সিদ্ধান্ত বিভিন্ন দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। পাশাপাশি মার্কিন নীতির ধারাবাহিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যা দেশটির কয়েকটি আন্তর্জাতিক অংশীদারের আস্থায় প্রভাব ফেলেছে।

তবে নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভোটারদের মাধ্যমে ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তন আনা এবং প্রশাসনের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ রয়েছে।

সালেহের মতে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে যাওয়ায় ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ওপর রাজনৈতিক নজরদারি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হবে।

তিনি বলেন, কংগ্রেসে আবারও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসবে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজের ক্ষমতাবলে কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার এখতিয়ার রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে তিনি সতর্ক করে বলেন, প্রেসিডেন্টের হাতে যথেষ্ট নির্বাহী ক্ষমতা থাকবে। এর মধ্যে কংগ্রেসে পাস হওয়া আইনে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে।

প্রেসিডেন্ট ভেটো দিলে হোয়াইট হাউসের বিরোধিতা থাকা কোনো আইন কার্যকর করা আইনপ্রণেতাদের জন্য কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে ভেটো বাতিল করতে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ডেমোক্র্যাটদের না থাকলে এই বাধা কাটানো সহজ হবে না।

ফলে কংগ্রেসে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য ট্রাম্পের আইন প্রণয়নের কর্মসূচি সীমিত করতে পারলেও নির্বাহী আদেশসহ প্রেসিডেন্টের অন্যান্য ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাঁর নীতি বাস্তবায়নের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারবে না।

বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের হিসাব

বাংলাদেশের জন্য এই পরিবর্তনের গুরুত্ব বিশেষ করে বাণিজ্য ও আঞ্চলিক কূটনীতির ক্ষেত্রে বেশি। ওয়াশিংটনের সঙ্গে পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিটি ঢাকার জন্য এখনো বড় একটি বিষয়। কারণ, চুক্তির শর্ত বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা এবং সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে।

কংগ্রেসে ক্ষমতার পরিবর্তনের ফলে ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে চুক্তিটি নিয়ে বাংলাদেশের উদ্বেগ ও আপত্তি তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে সালেহ মনে করেন, আগামী দুই বছরে ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের ধরনে বড় কোনো পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

ট্রাম্প ভারতের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি পাকিস্তানের সঙ্গেও উষ্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বিজয় এককভাবে এই দুই দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে তাৎক্ষণিক পরিবর্তন আনবে না।

তবে নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে প্রশাসনের আঞ্চলিক নীতিগুলোর ওপর কংগ্রেসের নজরদারি বাড়তে পারে। এতে কূটনৈতিক যোগাযোগের জন্য আরও কিছু পথ উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে ঢাকার তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার হওয়া উচিত, ক্ষমতার পালাবদলের মধ্যবর্তী সময়কে কাজে লাগিয়ে দায়িত্ব নিতে যাওয়া ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করা। একই সঙ্গে রিপাবলিকান নেতাদের সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কও ধরে রাখতে হবে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল রাতারাতি ওয়াশিংটনের পররাষ্ট্রনীতি বদলে দেবে না। তবে সেই নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের রাজনৈতিক পরিবেশে পরিবর্তন এনেছে। ঢাকার সামনে এখন সেই পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুই শিবিরের সঙ্গেই আরও বিস্তৃত ও দলনিরপেক্ষ কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।



আরও পড়ুন: