বুধবার

৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২০ কার্তিক, ১৪৩৩

সর্বশেষ
ডাকাতির স্বর্ণ ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জেরে খুন হন যুবদল নেতা শাকের: পুলিশ শ্রমিক আন্দোলনে ‘আওয়ামী দোসর’দের অপতৎপরতা; ব্যবস্থা নেয়ার দাবি বিপ্লব ও সংহতি দিবসে ঢাকায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা করবে বিএনপি এই আন্দোলন শ্রমিকদের নয়, পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে ইন্ধন দেয়া হচ্ছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাদ্রাসা শিক্ষককে মারধর; ধরা পড়ে যাচ্ছেন ‘বডিবিল্ডার’ শাহজালাল রুমি? ‎বাংলা এডিশনে প্রতিবেদন প্রকাশের পর মাদক ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দেয়ার ঘটনায় সিএমপির তদন্ত কমিটি গঠন রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীনের সহযোগিতা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর কেমন হতে পারে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া সম্পর্ক

শ্রমিক আন্দোলনে ‘আওয়ামী দোসর’দের অপতৎপরতা; ব্যবস্থা নেয়ার দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২০:১৭

শেয়ার

শ্রমিক আন্দোলনে ‘আওয়ামী দোসর’দের অপতৎপরতা; ব্যবস্থা নেয়ার দাবি
ছবি সংগৃহীত

গত কয়েকদিন ধরে সাভার, আশুলিয়া, মিরপুর ও গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক আন্দোলনের নামে হঠাৎ করেই শুরু হয় চরম অস্থিতিশীলতা। সাধারণ শ্রমিকদের ব্যানারে সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন মহাসড়ক অবরোধ করে শুরু হয় তীব্র বিক্ষোভ। মুহূর্তের মধ্যে সেই আন্দোলন রূপ নেয় সহিংসতায়। পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় ইতোমধ্যে দেশের প্রায় সাত শতাধিক পোশাক কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলন চলাকালে কেবল সড়ক অবরোধই করা হয়নি, বরং শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন পয়েন্টে মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে এবং পুলিশের গাড়িতেও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া, বেশ কয়েকটি পুলিশ বক্স ও কারখানার গুদামে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও নজরে এসেছে।

৩০ হাজার টাকা বেতনের দাবি ও বিতর্ক

চলমান শ্রমিক অসন্তোষের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে তীব্র মজুরি বৈষম্য ও জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি জানিয়েছে আন্দোলনকারীরা। তবে, এই দাবির পক্ষে-বিপক্ষে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা। সংশ্লিষ্টদের মতে, কারখানার প্রারম্ভিক পর্যায়ে একজন সম্পূর্ণ অদক্ষ শ্রমিক, যাঁর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কারিগরি দক্ষতা বা যোগ্যতা নেই, তাঁর ন্যূনতম বেতন কোনোভাবেই একলাফে এই অঙ্কে পৌঁছাতে পারে না।

মালিকপক্ষ ও অর্থনীতিবিদদের মতে, একজন গার্মেন্টস শ্রমিক কেবল নির্ধারিত ন্যূনতম বেতনই পান না, এর সাথে ওভারটাইম ও অন্যান্য ভাতাও যুক্ত থাকে। বর্তমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনা করে, ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে অতিরিক্ত কাজের পারিশ্রমিকসহ ১৬ থেকে ১৮ হাজার টাকা দাবি করাটা যৌক্তিক হতে পারে। কিন্তু, হুট করে ৩০ হাজার টাকার দাবি তোলাকে রপ্তানি খাত ও অর্থনীতি ধ্বংসের একটি সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা বলে মনে করছে বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অদক্ষ শ্রমিকের বেতন এত বেশি হলে, পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢোকা একজন স্নাতক তরুণের বেতন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, এই প্রশ্নও তোলাও তাহলে জরুরি হয়ে পড়বে।

আওয়ামী দোসরদের অপতৎপরতার অভিযোগ

এদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে এবং শিল্পখাতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর চক্র এখনো সক্রিয় রয়েছে। তৈরি পোশাক খাতে সাম্প্রতিক অস্থিতিশীলতার পেছনে স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের ইন্ধন ও নির্দেশের অভিযোগ উঠেছে। তৈরি পোশাক খাতের বহু কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে এখনো সাবেক স্বৈরাশাসক দলের ঘনিষ্ঠ ও অনুসারীরা বহাল রয়েছে। তারা বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী নেতাদের প্ররোচনা ও দিকনির্দেশনায় তৈরি পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা চালাচ্ছে।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর লোকজন একজোট হয়ে পোশাক শিল্পাঞ্চলগুলোতে অসন্তোষ ও অস্থিরতা তৈরি করছে। কারখানার অভ্যন্তরীণ বিষয় ও শ্রমিকদের দাবি-দাওযাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের উদ্দেশ্যে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দেশে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন জোগানোর কথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজেই জানিয়েছেন। তবে সীমান্তকেন্দ্রিক ইন্ধনের অভিযোগ উঠলেও, দেশের অভ্যন্তরে বিগত আওয়ামী শাসনের অর্থদাতা ও প্রভাবশালী আওয়ামী লীগারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়া নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, গার্মেন্টস শ্রমিকের ছদ্মবেশে শ্রমিক আন্দোলনের আড়ালে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ সংগঠনের এখন পর্যন্ত ৩৩ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশ। অভিযোগ উঠেছে, হাসিনা সরকারের আমলের যেসব সুবিধাভোগী আওয়ামী লীগের ব্যবসায়ী দীর্ঘ দিন ফ্যাসিবাদী কাঠামোকে অর্থায়ন করে টিকিয়ে রেখেছিলো, তাদের স্পর্শও করা হয়নি। তারা এখনও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য বহাল তবিয়তে পরিচালনা করছে এবং নিয়মিত গণমাধ্যমের আলোচনায় উপস্থিত হচ্ছে। পাশাপাশি, দেশের ভেতরে অবস্থানরত একটি চিহ্নিত গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গুজব ও রাজনৈতিক ন্যারেটিভ তৈরি করে পরিস্থিতি অস্থির করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যকারী এবং ভারতের মাটিতে শহীদ হাদীর হত্যাকাণ্ডের দিনে কটু মন্তব্য ও উল্লাস প্রকাশকারী সাংবাদিক আনিস আলমগীর জামিনে মুক্ত হয়ে প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছেন। সাথে আওয়ামী লীগের পক্ষে এখনও বয়ান তৈরি করছেন তিনি।

সচেতন মহল ও আন্দোলনকারীদের মতে, ২৪-শে শত শত শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে গণহত্যার দোসর এবং শহীদ হাদী হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা মূল কুশীলবরা যদি বিচার ও ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, তবে দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা রক্ষা করা দুরূহ হয়ে পড়বে। তাদের মতে, নেপথ্যের এই ইন্ধনদাতাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়া না হলে এই অস্থিরতা থামবে না। এখন পোশাক শ্রমিকদের ব্যানারে সড়ক অবরোধ করা হলেও, পরবর্তীতে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক কিংবা অন্য কোনো পেশাজীবীর ব্যানারে তা ছড়িয়ে দেয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পুরো কাঠামোর সংস্কার ছাড়া কেবল বিচ্ছিন্নভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই বৈশ্বিক অর্থনীতির এই ক্রান্তিলগ্নে দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে রক্ষা করতে এবং যেকোনো জাতীয় সংকট মোকাবিলায় কাদা-ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা।