শাহজালাল রুমি। গত বুধবার (২১ অক্টোবর) শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগ তুলে, টঙ্গির ক্বরিউল কুরআন ইন্টারন্যাশনাল মাদ্রাসার মুসলেম উদ্দিন নামের এক শিক্ষককে মারধর এবং মাদ্রাসায় ভাঙচুরের ঘটনায় যিনি জন্ম দিয়েছিলেন নানা আলোচনা-সমালোচনার। এবার মাদ্রাসায় ভাঙচুরের সেই ঘটনার প্রেক্ষিতেই তাঁকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
হাইকোর্টের আদেশে চার সপ্তাহের মধ্যে আত্মসমর্পণ
ওই মাদ্রাসায় ভাঙচুরের ঘটনায়, গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) শাহজালাল রুমিকে আসামি করে টঙ্গী পশ্চিম থানায় একটি মামলা করা হয়। রুমির বিরুদ্ধে করা সেই মামলার শুনানি শেষে তাঁকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছে হাইকোর্ট। মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ আদেশ দেয়। একইসঙ্গে, রুমিকে চার সপ্তাহের মধ্যে গাজীপুর মহানগর দায়রা জজ আদালতে আত্মসমর্পণের নির্দেশও দেয়া হয়।
ইলিয়াস হোসাইনের অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য
এর আগে শাহজালাল রুমি নামের এই অভিভাবকের টঙ্গীর সেই মাদ্রাসায় ভাঙচুর এবং শিক্ষককে মারধরের ঘটনায় অনুসন্ধানী সাংবাদিক ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ইলিয়াস হোসাইন তাঁর ধারাবাহিক অনুসন্ধানী সিরিজ ফিফটিন মিনিটসে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। যেখানে নিজের অনুসন্ধানে শাহজালাল রুমির সেই থাপ্পড়কাণ্ডের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন। আর সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেই সামনে আসে ঘটনাটিকে ঘিরে একের পর এক প্রশ্ন, অসংগতি ও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের প্রতিবেদনে মাদ্রাসায় শাহজালাল রুমির ভাঙচুরের ঘটনাটিকে পরিকল্পিত বলে দাবি করা হয়। শিক্ষককে মারধরের সময় রুমির চারপাশে কয়েকজনকে ক্যামেরা হাতে প্রস্তুত থাকার বিষয়টিও সামনে আনেন এই সাংবাদিক।
শুধু ভাঙচুরের ঘটনাই নয়, প্রতিবেদনে উঠে আসে মাদ্রাসার শিশুকে চুমু দেয়ার অভিযোগ নিয়ে শাহজালাল রুমির স্ববিরোধী বক্তব্যও।
এমনকি যে শিশুকে ঘিরে শিক্ষকের বিরুদ্ধে চুমুর অভিযোগ আনা হয়েছে, সেই শিশুর মায়ের সঙ্গে শাহজালাল রুমির তিন বছর আগেই বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে বলে, জানা যায় ফিফটিন মিনিটসের অনুসন্ধান থেকে।
এছাড়া, প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয় শাহজালাল রুমির এক নিকটাত্মীয়ের লেখা একটি চিঠি। সেই চিঠিতে তাঁর বিরুদ্ধে চুরি এবং বিভিন্ন মেয়ের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগও সামনে আনা হয়।
অন্যদিকে রুমির সঙ্গে বেশ কয়েকজন হিন্দু ব্যক্তির ঘনিষ্ঠতা এবং বিভিন্ন মন্দিরে তাঁর যাতায়াতের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। এসব তথ্যের সূত্র ধরে কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন।
সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য অসংগতি
এদিকে, শিশুকে যৌন হয়রানির অভিযোগের ঘটনাতেও ফিফটিন মিনিটসে তুলে ধরা হয় চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। প্রতিবেদনে সামনে আনা হয় চুমুর ঘটনার দিনের সিসিটিভি ফুটেজ। রুমির অভিযোগ অনুযায়ী, সিঁড়িতে, মাদ্রাসার শিক্ষক মুসলেম উদ্দিন মালিহাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়েছিলেন। তবে সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ক্লাস শেষে মালিহা যখন নিচে নামছিলেন, তখন শিক্ষকের সঙ্গে অন্য এক শিক্ষার্থী এবং একজন নারী শিক্ষিকাও ছিলেন। আর সেই শিক্ষার্থী ও শিক্ষিকার দাবি, সেদিন এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।
এছাড়া শিশুর পরিবারের সঙ্গে আপস করতে মাদ্রাসাশিক্ষক মিষ্টি নিয়ে মালিহাদের বাসায় গিয়েছিলেন—বিভিন্ন গণমাধ্যমে এমন দাবি করা হলেও, সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে প্রমাণ করা হয়, সেটি কোনো মিষ্টির ব্যাগ ছিল না; বরং ছিল বই খাতার ব্যাগ, যা শিক্ষক সব সময় নিজের কাছেই রাখতেন।
অপরদিকে মাদ্রাসার শিক্ষক মুসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন মালিহার নানা ও অন্যান্য অভিভাবকেরা। তাঁদের এমন বক্তব্যও তুলে ধরা হয় ওই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
প্রতিক্রিয়া ও রুমির অবস্থান নিয়ে ধোঁয়াশা
থাপ্পড়কাণ্ডের পর শাহজালাল রুমিকে ঘিরে অনেকের মধ্যেই তৈরি হয়েছিল সহানুভূতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাঁকে নিয়ে দেখা গিয়েছিল নানা প্রতিক্রিয়া। তবে সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর যেন পুরো ঘটনার মোড় ঘুরে যায় ভিন্ন দিকে। রুমিকে ঘিরে সামনে আসা একের পর এক তথ্য সাধারণ মানুষের মধ্যে জন্ম দেয় বিরূপ প্রতিক্রিয়ার। এই অবস্থায়, ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পরই শাহজালাল রুমিকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলো আদালত।
এরই মধ্যে, গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক খুদেবার্তায় দেশ ছাড়ার কথা জানান রুমি। তবে তাঁর এই ঘোষণার পরদিনই সামনে আসে ভিন্ন তথ্য। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দেশ ছাড়ার ঘোষণা দিলেও বাংলাদেশেই রয়েছেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে দেশের কোথায় আছেন, কী করছেন—তা নিয়ে এখনো কাটেনি ধোঁয়াশা। একদিকে আদালতের আত্মসমর্পণের নির্দেশ, অন্যদিকে দেশ ছাড়ার ঘোষণা দিয়েও দেশে থাকার খবর—সব মিলিয়ে রুমিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি আদালতে হাজির হবেন কি না, নাকি আত্মসমর্পণের নির্দেশ উপেক্ষা করেই থাকবেন আড়ালে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে নানা জল্পনা। আর শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পণ না করলে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, এখন সেই অপেক্ষাতেই দেশবাসী।
আরও পড়ুন:







