আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশ কনস্টেবল পদে জেলা কোটায় নিয়োগ পেতে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে ১ হাজার ১৭৩ জনের বিরুদ্ধে। পুলিশের তদন্ত কমিটির শনাক্ত করা এসব সদস্যের মধ্যে ৯৮০ জনই ঢাকা জেলার কোটায় নিয়োগ পেয়েছেন। তাদের অধিকাংশের নিয়োগ হয়েছে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে।
গণঅভ্যুত্থানের আগের এক দশকে সারা দেশে ৭৬ হাজার ৪৪৮ জন কনস্টেবল নিয়োগ পান। এসব নিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করে জেলা কোটা জালিয়াতির ঘটনা শনাক্ত করেছে তদন্ত কমিটি।
ঢাকায় নিয়োগ পাওয়া ৯৮০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
সূত্র জানায়, ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার করে নিয়োগ পাওয়া হিসেবে শনাক্ত ১ হাজার ১৭৩ জন কনস্টেবল এখনো চাকরিতে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৯৮০ জন ঢাকা জেলায় নিয়োগ পেয়েছেন, যা মোট শনাক্তের ৮৩ শতাংশের বেশি। ঢাকায় নিয়োগ পাওয়া এসব সদস্যের মধ্যে ৬৪৩ জন ২০১৫ সালে এবং ৩০৩ জন ২০১৪ সালে চাকরি পান।
তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ। জেলাটিতে জেলা কোটা জালিয়াতির ৯৩টি ঘটনা শনাক্ত হয়েছে।
গত ১৫ মার্চ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দেন। এরপর ৬৪ জেলার পুলিশ সুপারদের (এসপি) নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। জেলা পুলিশ সুপারদের পাঠানো প্রতিবেদন এখন পুলিশ সদর দপ্তরে যাচাই করা হচ্ছে। যাচাই শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
পুলিশ সদর দপ্তরের দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দিতে এসব কনস্টেবলের অনেকে ছোট ছোট জমি কিনেছিলেন। কেউ কেউ জেলা কোটার সুবিধা নিতে ভুয়া ঠিকানাও ব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওই দুই কর্মকর্তার একজন জানান, তদন্তের ফলাফল আরও যাচাই করা হচ্ছে, যাতে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তির নাম ভুল করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না হয়।
রাজনৈতিক প্রভাব ও পরীক্ষায় নম্বর বাড়ানোর অভিযোগ
তদন্তে অযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শতাধিক ব্যক্তির চাকরি পাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া লিখিত পরীক্ষায় খারাপ ফল করেও প্রায় ২০০ প্রার্থী মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক বেশি নম্বর পেয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, এসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। কোনো প্রার্থীর আত্মীয় আওয়ামী লীগের নেতা হলেই তিনি ওই আত্মীয়ের প্রভাব খাটিয়ে চাকরি পেয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
পুলিশে কনস্টেবল নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। জেলা পুলিশের প্রধানেরা রাজনৈতিক নেতা বা প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সুপারিশে এবং ঘুষের বিনিময়ে কনস্টেবল নিয়োগ দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমান নিয়োগ পদ্ধতিতে প্রতিটি জেলার পুলিশ সুপার প্রশিক্ষণার্থী ট্রেইনি রিক্রুট কনস্টেবল (টিআরসি) নিয়োগের চূড়ান্ত সুপারিশ করেন। নির্বাচিত প্রার্থীদের পুলিশ প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিতে হয়। প্রশিক্ষণ শেষে সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানেই জেলার পুলিশ সুপারেরা তাদের নিয়োগপত্র দেন।
ঢাকার নিয়োগে সাবেক পুলিশ সুপার হাবিবুরের নাম
তদন্তসংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ঢাকায় সন্দেহজনক ৯৮০টি নিয়োগের মধ্যে ৯৪৬টি হয়েছিল ২০১৪ ও ২০১৫ সালে। ওই সময় ঢাকার পুলিশ সুপার ছিলেন মো. হাবিবুর রহমান।
মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলায় সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাবিবুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) তার বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতি, নিয়োগে অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ পাচার এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্ত করছে। বর্তমানে তিনি পলাতক।
নারায়ণগঞ্জে আগেও নিয়োগে অনিয়ম শনাক্ত
নারায়ণগঞ্জে কনস্টেবল নিয়োগে অনিয়মের তথ্য ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়। ২০১৯ সালে তৎকালীন পুলিশ সুপার মুহাম্মদ হারুন অর রশীদের দায়িত্ব পালনকালে ১৮ জন কনস্টেবল নিয়োগে অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়।
ওই ১৮ জনের মধ্যে পাঁচজন জমি বিক্রির দলিলে একই নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করেছিলেন। অন্য তিনজনের জমির দলিলেও একই নিবন্ধন নম্বর পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ১১ জনের জমির দলিলে একই মৌজা, দাগ ও খতিয়ান নম্বরের উল্লেখ ছিল। তাদের জমির নিবন্ধন নম্বরও ছিল অভিন্ন।
পুলিশ সদর দপ্তরের অভ্যন্তরীণ তদন্তের পর ওই ১৮ কনস্টেবলকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তবে হারুন ২০২২ সালে ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান। একই বছর তাকে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান করা হয়।
হারুন এখনো পলাতক। দায়িত্বে অনুপস্থিত থাকা এবং সরকারি আদেশ অমান্য করার অভিযোগে গত ৩১ অক্টোবর তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের কয়েকটি মামলা এবং দুদকের দায়ের করা দুটি মামলা রয়েছে।
পাঁচ জেলায় কোটা জালিয়াতির অভিযোগ সংসদে
গত ২৭ আগস্ট জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জেলা কোটা জালিয়াতির মাধ্যমে হাজার হাজার কনস্টেবল, উপপরিদর্শক (এসআই) ও পুলিশের অন্যান্য পদে লোকবল নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশ নিয়োগে অনিয়মের ক্ষেত্রে তিনি ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ও কিশোরগঞ্জের নাম উল্লেখ করেন। এসব জেলায় কোটার সুবিধা পেতে প্রার্থীরা ছোট ছোট জমি কিনে স্থায়ী ঠিকানা পরিবর্তন করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এ ধরনের চার থেকে পাঁচটি জেলা চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলেও জানান তিনি।
আইজিপির ১৫ মার্চের নির্দেশনার পর কনস্টেবল নিয়োগে দুর্নীতি, নিয়োগবিধি লঙ্ঘন ও অন্যান্য অনিয়ম তদন্তে জেলা পর্যায়ে কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট জেলার পুলিশ সুপারদের এসব কমিটির প্রধান করা হয়।
কমিটিগুলোকে ভুয়া ঠিকানা ব্যবহার, স্থানীয় বাসিন্দা পরিচয় পেতে জমি কেনা, পরীক্ষায় বিশেষ সুবিধা দেওয়া, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরে অসঙ্গতি এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে বলা হয়। এসব বিষয়ে তদন্ত করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন ১৫ এপ্রিলের মধ্যে জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
নিয়োগের তথ্য যাচাই, সুপারিশ বা অনুমোদনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
নিয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ
জেলা কোটা জালিয়াতির অভিযোগ প্রসঙ্গে সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ এখনো রয়েছে। জমি কেনার মাধ্যমে অন্য জেলার প্রার্থীদের নিজেদের জেলার বাসিন্দা হিসেবে পরিচয় দেওয়ার সুযোগ জেলা পুলিশের সুপারেরা করে দিতে পারেন।
বাহারুল আলম একসময় পুলিশ সদর দপ্তরের নিয়োগ ও ক্যারিয়ার পরিকল্পনা বিভাগে সহকারী মহাপরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দিকে পুলিশ সদর দপ্তর নিয়োগে অনিয়ম ঠেকাতে কিছু উদ্যোগ নিয়েছিল।
এর অংশ হিসেবে লিখিত পরীক্ষার নম্বর ৪০ থেকে বাড়িয়ে ৪৫ করা হয়। অন্যদিকে, মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০ থেকে কমিয়ে ১৫ করা হয়। মৌখিক পরীক্ষায় অস্বাভাবিক বেশি নম্বর দিয়ে কাউকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার সুযোগ কমানো ছিল এর উদ্দেশ্য।
এ ছাড়া প্রশ্নপত্র তৈরি ও উত্তরপত্র মূল্যায়নের দায়িত্বও পুলিশ সদর দপ্তর নিজেদের হাতে নেয়। এর আগে জেলা পুলিশের ইউনিটগুলো নিজেরাই প্রশ্নপত্র তৈরি ও উত্তরপত্র মূল্যায়ন করত।
আরও পড়ুন:







