সংবিধান সংশোধন নাকি সংস্কার-এই প্রশ্নে সরকার ও বিরোধী দলগুলোর মতবিরোধের কারণে থমকে আছে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন। বিএনপি সরকার গঠনের আট মাসেরও বেশি সময় পার হলেও সংবিধানের প্রধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। দুই পক্ষের বিরোধে সনদের ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিরোধ
সরকারের অবস্থান, সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমেই সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিরোধী দলগুলোর দাবি, গণভোটে জনগণের অনুমোদন পাওয়া প্রস্তাবগুলো কোনো পরিবর্তন ছাড়াই হুবহু বাস্তবায়ন করতে হবে। এ মতবিরোধের কারণে সরকার গঠিত বিশেষ কমিটিতে যোগ দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে বিরোধী দলগুলো।
রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষর করার পর এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। তবে সনদের প্রধান সংস্কার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নে অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকারের নেওয়া বেশ কিছু সংস্কার উদ্যোগ বাতিল করেছে। একই সঙ্গে গণভোটে অনুমোদিত প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের নেতৃত্বে প্রায় নয় মাস আলোচনার পর গত বছর ১৭ অক্টোবর ৩০টি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে জুলাই সনদ স্বাক্ষরিত হয়। সনদের প্রধান প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমানো, নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা।
গত বছর ১৩ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার সনদ বাস্তবায়নে একটি আদেশ জারি করে। তবে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি সরকার গণভোটের অধ্যাদেশ পাস করেনি। জুলাই আদেশও সংসদে তোলা হয়নি। এর পরিবর্তে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী জানুয়ারিতে কমিটির প্রতিবেদন জমা দেওয়ার কথা রয়েছে।
সংস্কার পরিষদের শপথ না হওয়া নিয়ে প্রশ্ন
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, শুরুতেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যরা শপথ নিলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো।
তিনি বলেন, সংস্কারের ক্ষমতা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের হাতেই থাকত। কিন্তু তারা দেশের মানুষের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। অথচ এখন যা ঘটছে, তা অত্যন্ত হতাশাজনক।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালট, উচ্চকক্ষের অনুমোদন এবং সাংবিধানিক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। জুডিশিয়াল অ্যাপয়েন্টমেন্ট কাউন্সিল ও সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয়সংক্রান্ত অধ্যাদেশও বাতিল করা হয়েছে। পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগেও অগ্রগতি নেই।
অন্যদিকে সরকারের নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষ কমিটিতে যোগ দিতে নারাজ জামায়াত
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বারবার বলে আসছেন, জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করা হবে। এ জন্য তিনি বিরোধী দলগুলোকে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে জামায়াতে ইসলামী মনে করে, গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নতুন করে আলোচনার প্রয়োজন নেই।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, যেসব বিষয় গণভোটে পাস হয়েছে, সেগুলো নিয়ে কমিটিতে নতুন করে আলোচনার কোনো যুক্তি নেই। তিনি সরকারের এই উদ্যোগকে অহেতুক ও হাস্যকর বলে মন্তব্য করেন।
জামায়াতসহ অন্যান্য বিরোধী দলের বক্তব্য, গণভোটে জনগণ যেসব সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিয়েছে, সেগুলো কোনো পরিবর্তন বা বাদ না দিয়ে হুবহু বাস্তবায়ন করতে হবে। সংবিধান সংশোধনের অজুহাতে সনদের কোনো প্রস্তাব পরিবর্তনের সুযোগ নেই বলে মনে করে দলগুলো।
জাতীয় ঐকমত্যের ওপর গুরুত্ব বিশ্লেষকদের
রাষ্ট্র কাঠামোর আমূল পরিবর্তন ও সংবিধান সংস্কারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুম।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ রক্ষায় সরকারের সামনে এখনো সুযোগ রয়েছে। প্রথম কর্মদিবসের পর থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ করার মতো যথেষ্ট সময় সরকারের হাতে আছে।
সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হলে সরকার ও জনগণ উভয়কেই মারাত্মক পরিণতির মুখে পড়তে হবে বলে সতর্ক করেন তিনি। এত বড় গণঅভ্যুত্থানের পর সরকারের এ ধরনের আচরণ কোনোভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন হাসনাত কাইয়ুম।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রয়োজন। শুধু বিএনপি ও জামায়াতের সমঝোতার মাধ্যমে সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ প্রক্রিয়ায় সব রাজনৈতিক পক্ষকে যুক্ত করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান বলেন, ঐকমত্যের বিষয়গুলো সঠিকভাবে সমাধান না করে জোর করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে তা গ্রহণযোগ্য হবে না। গণভোটে পাস হওয়ার পরও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না হওয়া দুঃখজনক। তাই জোর করার পরিবর্তে আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্য গড়ে তোলা জরুরি।
তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক আন্তরিকতা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা ছাড়া সমঝোতা সম্ভব নয়। সত্যিকারের ঐকমত্য গড়ে তুলতে জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে সব পক্ষকে একসঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে।
আরও পড়ুন:







