দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্প বাস্তবায়নে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও সরকারের যুগ্ম সচিব আসমা আরা বেগম দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে তিনি দায়িত্ব ছাড়তে চান। প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মাথায় তাঁর এ সিদ্ধান্তে প্রায় ১৭ বছর ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কারণ দেখিয়ে আবেদন
আসমা আরা বেগম তাঁর অব্যাহতির আবেদন জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিবের কাছে পাঠিয়েছেন। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যানের মাধ্যমে পাঠানো চিঠিতে তিনি ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন।
চিঠিতে তিনি জানান, তাঁর দুই সন্তান বর্তমানে বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে। তাদের শিক্ষা, মানসিক বিকাশ ও যথাযথ তত্ত্বাবধানের জন্য মায়ের প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য প্রয়োজন। এ অবস্থায় এত বড় ও জটিল প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে প্রয়োজনীয় সময়, মনোযোগ ও শ্রম দেওয়া তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে আসমা আরা বেগম জানান, ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পটিকে তিনি নিজের সন্তানের মতো ভালোবাসতেন। দীর্ঘ ১৭ বছরেও বাস্তবায়িত না হওয়া প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন নিয়েই তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। প্রকল্পের জন্য অনেক কাজ করেছেন এবং এটি বাস্তবায়নে তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাগত আগ্রহ ছিল। তবে সংশ্লিষ্ট অনেকের অসহযোগিতার কারণে প্রকল্পটি এগিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি আর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকতে চান না।
দেড় যুগেও শুরু হয়নি মূল কাজ
প্রকল্প পরিচালকের অব্যাহতির আবেদনপত্রে প্রকল্পটির দীর্ঘ ইতিহাস ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তাঁর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও উঠে এসেছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৯ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। এরপর দীর্ঘ ১৭ বছরেও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতায় ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। পরে ২০২৬ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক আদেশ জারি করা হয়।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তা হিসেবে আসমা আরা বেগম প্রকল্পের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইএসডিবি) অর্থায়ন এবং বাস্তবায়ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। গত ২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের আদেশে তাঁকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়। ৭ সেপ্টেম্বর তিনি বিপিসিতে প্রেষণে যোগদান করেন।
তবে দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রকল্পের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি। এর মধ্যে পরামর্শক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হয়। এখন তাঁর অব্যাহতির আবেদন গৃহীত হলে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের জন্য আবারও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
কারিগরি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পিডি নিয়োগের দাবি
সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ইআরএল দ্বিতীয় ইউনিট বা মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড একটি উচ্চমাত্রার কারিগরি প্রকল্প। এ ধরনের প্রকল্প পরিচালনার জন্য কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে বারবার বাধা তৈরি হতে পারে।
তাঁরা আরও জানান, প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের শুরুতেই অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। চূড়ান্ত মূল্যায়নের পরও সেই নিয়োগপ্রক্রিয়া বাতিল করে সরকার। এসব বিষয় নিয়ে মন্ত্রণালয়েও অস্বস্তি রয়েছে।
বিপিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমান প্রকল্প পরিচালক অব্যাহতি নিলে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হবে, যাতে পরবর্তী সময়ে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কোনো কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরিশোধন সক্ষমতা বাড়বে বছরে ৩০ লাখ টন
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। ২০০৯ সালে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়। পরে ২০১২ সালে বার্ষিক ৩০ লাখ মেট্রিক টন পরিশোধন সক্ষমতার ইআরএল ইউনিট-২ স্থাপনের প্রকল্প হাতে নেয় বিপিসি। তবে ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
বর্তমানে ইস্টার্ন রিফাইনারির বছরে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধনের সক্ষমতা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট চালু হলে বছরে আরও ৩০ লাখ টন অপরিশোধিত জ্বালানি তেল পরিশোধন করা সম্ভব হবে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়বে। পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের সুযোগ তৈরি হবে।
প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। ২০১৬ সালে কয়েক দফা সংশোধনের পর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা।
প্রকল্পের ফিড কন্ট্রাক্টর হিসেবে ফ্রান্সের টেকনিপকে নিয়োগ দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি প্রকল্পের নকশা প্রণয়ন করে। অন্যদিকে, প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক হিসেবে ভারতের প্রতিষ্ঠান ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেডকে (ইআইএল) নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি করে বিপিসি। তবে এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করা যায়নি।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে। ২০২২ সালের শেষ দিকে সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি ৯৩ লাখ ৯২ হাজার টাকা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে প্রকল্প প্রস্তাব আবার সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২৩ হাজার ৭৩৬ কোটি ১০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ৭০ শতাংশ সরকারি অর্থায়ন এবং ৩০ শতাংশ বিপিসির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৩১ হাজার কোটি টাকা।
প্রায় ১৭ বছর ধরে পরিকল্পনা, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, অর্থায়ন ও প্রশাসনিক অনুমোদনের বিভিন্ন ধাপ পেরিয়েও প্রকল্পটির মূল কাজ শুরু হয়নি। পরামর্শক নিয়োগে জটিলতার পর এবার প্রকল্প পরিচালকের অব্যাহতির আবেদন নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ফলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ তেল পরিশোধন প্রকল্পের বাস্তবায়ন কবে শুরু হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আরও পড়ুন:







