বুধবার

৪ নভেম্বর, ২০২৬ ২০ কার্তিক, ১৪৩৩

বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার উদীয়মান অর্থনীতির অর্ধেক

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ০৭:৫৩

আপডেট: ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ০৮:০৮

শেয়ার

বাংলাদেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার উদীয়মান অর্থনীতির অর্ধেক
ছবি এআই মাধ্যমে তৈরি

দেশের কর্মক্ষম মানুষের ৮৪ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। এ সংখ্যা প্রায় ৫ কোটি ৮০ লাখ। স্নাতক বা তার বেশি শিক্ষিত ব্যক্তিদের ৬০ শতাংশের বেশি আনুষ্ঠানিক চাকরি না পেয়ে অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এসব কাজে তাঁদের আয় আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ কম। অন্যদিকে বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশ, যা ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হারের অর্ধেক।

বিশ্বব্যাংকের ২০২৬ সালের ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রাজধানীর একটি হোটেলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিস প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। এ উপলক্ষে আলোচনা সভারও আয়োজন করা হয়।

উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক কাজে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাঝারি ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও মোট কর্মসংস্থানের ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক। ফলে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের বড় অংশ কাঙ্ক্ষিত ও সুরক্ষিত কর্মসংস্থান পাচ্ছেন না। পর্যাপ্ত আনুষ্ঠানিক চাকরির সুযোগ না থাকায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ছোট উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছেন।

বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনানুষ্ঠানিক খাতের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ উদ্যোক্তা জানিয়েছেন, বিকল্প বা নিয়মিত চাকরি না পেয়ে তাঁরা এ ধরনের উদ্যোগ শুরু করেছেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের অনানুষ্ঠানিক খাত জরিপ বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছে বিশ্বব্যাংক।

বাংলাদেশে আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠানে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির বার্ষিক হার ২ দশমিক ৭ শতাংশ। বিপরীতে ৮২টি উদীয়মান অর্থনীতির দেশের গড় হার ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ এসব দেশের গড় কর্মসংস্থান বৃদ্ধির তুলনায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে।

শ্রম উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ ও ভারতের অবস্থান দুর্বল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ দুই দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর শ্রম উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির হার বিশ্বের অধিকাংশ দেশের তুলনায় কম। বিশেষ করে পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন প্রতিষ্ঠানের তুলনায় শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে পিছিয়ে রয়েছে।

২০৪৫ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৪৫ সালে বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। এরপর এ অনুপাত কমতে থাকবে এবং বাড়বে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা। ২০৫১ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের অনুপাত ১৪ শতাংশে পৌঁছাবে। তখন বাংলাদেশ বয়স্ক সমাজে পরিণত হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য বাংলাদেশের হাতে সময় বেশি নেই। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর পরও কয়েক বছর এ সুবিধা অব্যাহত থাকবে। তবে এ সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে এ সুযোগ কাজে লাগানো কঠিন হবে।

জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষম মানুষের ওপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়বে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে। অথচ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বাংলাদেশের প্রস্তুতি এখনো দুর্বল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবায় শহর-গ্রামে বড় বৈষম্য

স্বাস্থ্যসেবায় শহর ও গ্রামের মধ্যে বড় ধরনের বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরেছে বিশ্বব্যাংক। দেশে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে বসবাস করলেও স্বাস্থ্যকর্মীদের মাত্র ২০ শতাংশ সেখানে কর্মরত। বিপরীতে শহরে চিকিৎসকের ঘনত্ব গ্রামের তুলনায় ১৮ গুণ বেশি।

অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর প্রস্তুতিও পর্যাপ্ত নয়। এ ধরনের রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সেবার সব উপাদান রয়েছে মাত্র ১৮ শতাংশ কেন্দ্রে। বাকি ৮২ শতাংশ কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি রয়েছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম পাওয়া যায় মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ কেন্দ্রে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর মাত্র ১ দশমিক ৬ শতাংশে ইনজেকশনযোগ্য ইনসুলিন এবং ৩৮ শতাংশে মেটফরমিন পাওয়া যায়। হৃদ্‌রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান একসঙ্গে রয়েছে ১ শতাংশের কম প্রতিষ্ঠানে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। কিন্তু এ খাতে বাংলাদেশের ব্যয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন।

কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নে পদক্ষেপের তাগিদ

প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে, এশিয়ার প্রধান অর্থনীতিবিদ ফ্রান্সিসকা লিজেলোটে ওনসর্গ এবং বাংলাদেশ ও ভুটানের অপারেশনস ম্যানেজার গেইল মার্টিন।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনুষ্ঠিত প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মো. জাহিদ হোসেন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি, পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক নাজনীন আহমেদ এবং বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর জেম মেতে। আলোচনা পর্ব সঞ্চালনা করেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটানের ডিভিশন ডিরেক্টর জ্যাঁ পেসমে।

জ্যাঁ পেসমে বলেন, বাংলাদেশের জনমিতিক সুযোগ কাজে লাগানো নির্ভর করছে এখন দেশটি কী পদক্ষেপ নেয়, তার ওপর। ভালো চাকরি সৃষ্টিতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা, তরুণদের শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষতায় দক্ষ করে তোলা এবং নারীদের কর্মসংস্থানের বাধা দূর করা জরুরি।

নারী ও শিশু বিষয়ক এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, জনমিতিক সুবিধার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার শিক্ষা খাতে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বরাদ্দ নিশ্চিত করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি তরুণ প্রজন্মের দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের কল্যাণের পাশাপাশি তাঁদের পরিচর্যা ও সার্বিক সহায়তার জন্য পিতা-মাতাদেরও বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।

পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি বলেন, সরকার একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র বিনির্মাণে জীবনচক্রভিত্তিক সুরক্ষা কৌশল গ্রহণ করেছে। এ কৌশলে এক দিনের নবজাতকের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও সম্মানের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।