মঙ্গলবার

৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৯ কার্তিক, ১৪৩৩

শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকার-বিরোধী দলকে আলোচনায় বসার তাগিদ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:৫২

শেয়ার

শ্রমিক অসন্তোষ নিরসনে সরকার-বিরোধী দলকে আলোচনায় বসার তাগিদ
ছবি সংগৃহীত

৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ ও সাভার-আশুলিয়ায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, সড়ক অবরোধ ও কারখানা বন্ধের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। তাঁদের কেউ সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বকে সংকটের কারণ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ আন্দোলনের পেছনে দেশি-বিদেশি মহলের ইন্ধনের আশঙ্কা করছেন। এ পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে সরকার, বিরোধী দল ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে এক টেবিলে বসে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান খুঁজে বের করার তাগিদ দিয়েছেন রাজনীতিবিদদের কেউ কেউ।

গত ১ নভেম্বর সরকার পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করে। এ বিষয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়, যা পরে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০২৬)-এর ১৩৮ ধারার ৩(ক) ও ৩(খ) উপধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এবং ১৩৯ ধারায় নির্ধারিত কার্যাবলি সম্পাদনের উদ্দেশ্যে এ বোর্ড গঠন করা হয়েছে।

তবে বোর্ডের সভার নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। শ্রমিকদের একাংশের আশঙ্কা, সভা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হলে আগামী ডিসেম্বর থেকে বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে। এ নিয়ে তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন শ্রমিক।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার-আশুলিয়া ও ঢাকার মিরপুরে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন স্থানে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকেরা। মিরপুর-১৪ নম্বর এলাকায় বিক্ষোভের কারণে মেট্রোরেল চলাচল ব্যাহত হয়। পরিস্থিতির মধ্যে কয়েকশ শিল্পকারখানা বন্ধ ও ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।

আন্দোলনের পেছনে বিদেশি ইন্ধনের আশঙ্কা দুদুর

শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে ইন্ধনের অভিযোগ তুলেছে সরকার ও বিরোধী দল। গত ১ নভেম্বর সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, সীমান্তের ওপার থেকে ইন্ধন দেওয়া হচ্ছে। সরকার বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করবে।

পরদিন ২ নভেম্বর প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতার পেছনে ষড়যন্ত্রকারী ও ধান্দাবাজদের উসকানি থাকতে পারে। পরিস্থিতি উসকে দিয়ে পোশাকশিল্প ধ্বংসের অপচেষ্টা রুখতে সরকারকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু মনে করেন, শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার সঙ্গে সরকারের খুব বেশি দূরত্ব নেই। এ জন্যই মজুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছে। তবে বোর্ড গঠনের পরও কিছু প্রক্রিয়া বাকি থাকে। বোর্ডের বৈঠক করতেও কমপক্ষে এক থেকে দুই মাস সময় প্রয়োজন হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা উল্লেখ করে দুদু বলেন, আটক নাশকতাকারীদের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দেখা গেছে। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতির নেপথ্যে বিদেশি শক্তির ইন্ধনও থাকতে পারে।

তিনি বলেন, কেউ যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অবৈধ স্বার্থ হাসিল করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের সতর্ক থাকতে হবে।

সরকার ও বিজিএমইএর সিদ্ধান্তহীনতাকে দায়ী করছেন মান্না

নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না মনে করেন, শ্রমিকদের বর্তমান মজুরি দিয়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ করা কঠিন। ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা দিয়ে শ্রমিকদের সংসার চালানো কঠিন। এমনকি ৩০ হাজার টাকা দিয়েও অনেকের পক্ষে স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, মজুরি বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী হলেও সরকার ও বিজিএমইএর সিদ্ধান্তহীনতার কারণে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। সরকারের আরও আগে উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল।

মান্নার মতে, সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ নিজেদের স্বার্থে নতুন ইস্যু তৈরি করতে পারে। এ অবস্থায় সবার সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। প্রয়োজনে বিরোধী দলসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এক টেবিলে বসতে পারে সরকার।

মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্বের অভিযোগ প্রিন্সের

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্সের মতে, সরকার ও বিজিএমইএ যথাসময়ে ন্যায্য ভূমিকা না নেওয়ায় বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।

তিনি জানান, শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতি তিন বছর পরপর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের নিয়ম রয়েছে। সে হিসাবে আগামী ডিসেম্বর থেকেই শ্রমিকদের বেতন বাড়ার কথা। কিন্তু মজুরি বোর্ড গঠনে বিলম্ব হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, বোর্ড গঠনের পর মজুরি নির্ধারণে ছয় মাস বা তারও বেশি সময় লাগে। ফলে ডিসেম্বর থেকে বেতন বাড়বে কি না, তা নিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে সন্দেহ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

প্রিন্সের মতে, মজুরি বোর্ড গঠনের সময় সরকার যদি স্পষ্টভাবে জানাত যে ডিসেম্বর থেকেই নতুন ন্যূনতম মজুরি কার্যকর হবে এবং জানুয়ারিতে ডিসেম্বর মাসের বেতন বর্ধিত হারে দেওয়া হবে, তাহলে অনেক সংকট এড়ানো সম্ভব হতো।

শ্রমিকদের কম বেতনের পাশাপাশি কর্মপরিবেশের সমস্যার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, নারী শ্রমিকেরা বিভিন্নভাবে নিগ্রহের শিকার হন। বিভিন্ন কারণে চাকরিচ্যুত অনেক শ্রমিককে দীর্ঘদিন ধরে কালো তালিকাভুক্ত করে রাখা হয়, যাতে তাঁরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিতে না পারেন। এটিকে বেআইনি এবং শ্রমিকদের কাজের অধিকার খর্ব করার শামিল বলে মন্তব্য করেন তিনি।

প্রিন্স বলেন, আন্দোলনে কেউ ইন্ধন দিয়ে থাকলে সরকার তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে আন্দোলন ও ভাঙচুর এক বিষয় নয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আন্দোলনের ঘটনায় গ্রেপ্তার শ্রমিকদের নিঃশর্ত মুক্তি, শ্রমিকদের ওপর নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা এবং দ্রুত মজুরি বোর্ডের সভা আয়োজন করা প্রয়োজন।

তিনি আরও বলেন, আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত নতুন ন্যূনতম মজুরি ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দিলে শ্রমিকদের অসন্তোষ অনেকটাই কমতে পারে।

বেতন বাড়ানোর ক্ষেত্রে শিল্প ও শ্রমিক উভয়ের স্বার্থ রক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেন প্রিন্স। তাঁর মতে, বেতন বাড়লে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতাও বাড়ে। উৎপাদন, রপ্তানি ও আয় কমেনি বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, শিল্পের আয় যেন শুধু মালিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, শ্রমিকেরাও যেন তাঁদের ন্যায্য হিস্যা পান, সে বিষয়ে সরকার ও বিজিএমইএর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।

দ্রুত যৌক্তিক বেতন স্কেল ঘোষণার পক্ষে মঞ্জু

আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু মনে করেন, শ্রমিকদের বেতন বৃদ্ধির দাবি যৌক্তিক। সরকারের নবম পে-স্কেল ঘোষণার পর দেশের অন্যান্য শ্রমজীবী ও পেশাজীবীদের মধ্যেও বেতন বাড়ানোর দাবি জোরালো হতে পারে বলে তাঁরা ধারণা করেছিলেন।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে সহিংস রূপ দেওয়ার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে তাঁর কাছে বিষয়টি স্পষ্ট। সরকার মজুরি বোর্ড গঠন করায় তিনি সাধুবাদ জানান। তবে তাঁর মতে, দ্রুত একটি যৌক্তিক বেতন স্কেল ঘোষণা করা হলে আপাতত সংকটের সমাধান সম্ভব।