মঙ্গলবার

৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৯ কার্তিক, ১৪৩৩

আগাম সতর্কবার্তার পরও পোশাকশিল্পে অস্থিরতা, প্রশ্ন দায়িত্ব পালন নিয়ে

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ০৮:৫৮

শেয়ার

আগাম সতর্কবার্তার পরও পোশাকশিল্পে অস্থিরতা, প্রশ্ন দায়িত্ব পালন নিয়ে
ছবি সংগৃহীত

আগাম সতর্কবার্তা থাকার পরও তৈরি পোশাকশিল্পে শ্রমিক অসন্তোষ, বিক্ষোভ ও সহিংসতা ঠেকানো যায়নি। সম্ভাব্য অস্থিরতার আশঙ্কায় গত ১৮ অক্টোবর পুলিশসহ সব আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো, শ্রমিক সংগঠনগুলোর তৎপরতা পর্যবেক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের নির্দেশনাও ছিল। এরপরও শিল্পাঞ্চলে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর আগাম প্রস্তুতি ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সতর্কবার্তায় ছিল ডিসেম্বরের সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই সতর্কবার্তার একটি অনুলিপি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিসেম্বরকে ঘিরে পোশাকশিল্পে সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণকে কেন্দ্র করে আন্দোলন-বিক্ষোভ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে আগাম প্রস্তুতি, গোয়েন্দা নজরদারি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক-২ শাখা থেকে ১৮ অক্টোবর জারি করা চিঠিতে (স্মারক নম্বর: ৪৪.০০.০০০০.০০০.০৭৫.০৩.০০০৩.২৬.৯৯৪) সম্ভাব্য শ্রম অসন্তোষ মোকাবিলায় একাধিক করণীয় তুলে ধরা হয়। এতে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়।

চিঠিতে সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো প্রণয়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির বিষয়টিও আলোচনায় থাকার কথা উল্লেখ করা হয়। পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বিভিন্ন সময়ে পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধিত) আইন ২০২৬ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি পুনর্নির্ধারণের বিষয়টিও চিঠিতে তুলে ধরা হয়।

আগামী ২০ ডিসেম্বর গার্মেন্টস খাতের শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করে সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে শ্রমিকদের প্রত্যাশা, মালিকপক্ষের অবস্থান এবং বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের তৎপরতা থেকে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।

এ কারণে শ্রম অসন্তোষের নামে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছিল। শ্রমিক সংগঠনগুলোর আন্দোলন, কর্মসূচি ও স্থানীয় পর্যায়ের তৎপরতার ওপর নজরদারি বাড়ানোর সুপারিশও ছিল। পাশাপাশি শ্রমিকদের দাবিদাওয়া ও অসন্তোষের কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। গার্মেন্টস ও নিটওয়্যার শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের সুপারিশ ছিল চিঠিতে। শ্রমিকদের প্রকৃত দাবিদাওয়া, মজুরি নিয়ে অসন্তুষ্টি কিংবা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের উসকানি থাকলে তা আগেই শনাক্ত করার সুযোগ ছিল।

সহিংসতার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে গতকাল সোমবার বিকালে শ্রমিকনেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের বলেন, তৈরি পোশাকশিল্পে চলমান অস্থিরতা ও সহিংস আন্দোলনের পেছনে ফ্যাসিবাদের সমর্থক ও সুযোগসন্ধানীদের ইন্ধন রয়েছে।

তিনি বলেন, আন্দোলনের নামে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ শিল্প খাত ধ্বংস করতে একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে সহিংসতা ছড়াচ্ছে। সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণে মুখোশধারী বহিরাগতদের এমন কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার তদন্ত চান বিশেষজ্ঞরা

আগাম সতর্কবার্তার পরও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞদের অনেকে। তাদের কেউ কেউ সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থার ভেতরে দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা গাফিলতির বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত হওয়া উচিত। শিল্পকারখানা অচল হলে দেশ অচল হয়ে পড়বে। শিল্পের পরিবেশ রক্ষায় সরকারের বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। দায়িত্ব পালনে কারও অবহেলা পাওয়া গেলে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন দায়িত্বহীনতার সাহস না করে।

গোয়েন্দা ও পুলিশি ব্যর্থতার কারণে আন্দোলন, ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা ঘটতে পারে বলে মনে করেন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে তথ্য থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আগে থেকে প্রস্তুতি নেননি। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের মধ্যে একটি গোষ্ঠী প্রবেশ করে অসন্তোষকে আন্দোলনে রূপান্তর করেছে।

শিল্প পুলিশের দাবি, যথাসাধ্য সমন্বয় করা হয়েছে

তবে শিল্প পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি গাজী জসীমউদ্দীন দাবি করেছেন, আগাম সতর্কতা হিসেবে তারা সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেছেন। অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গেও যথাসাধ্য সমন্বয় করা হয়েছে বলে জানান তিনি। তবে তার ভাষ্য, অস্থিরতার সূচনা হয়েছে রাজধানীতে, যা ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) আওতাধীন এলাকা।

তিনি আরও বলেন, অনেক শ্রমিকনেতা ও মালিকদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ একটি দলের অনুসারী এবং নেতাকর্মী রয়েছেন। এই আন্দোলনে তারা নানাভাবে ভূমিকা রাখছেন। বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে শ্রমিকদের উসকানি দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সেজে অনেকে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের এসব বিষয়ে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।

অস্থিরতায় উৎপাদন ও রপ্তানি কার্যক্রমে প্রভাবের শঙ্কা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাকশিল্প দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত। এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা সৃষ্টি হলে উৎপাদন, রপ্তানি আদেশ ও সরবরাহব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারখানায় কর্মবিরতি, সড়ক অবরোধ কিংবা সংঘাতের পরিস্থিতিতে শ্রমিক ও মালিকপক্ষের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া বিবেচনায় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। আগাম সতর্কবার্তা থাকার পরও কেন অস্থিরতা ঠেকানো গেল না, কারা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন এবং মাঠপর্যায়ে কী ধরনের ঘাটতি ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি উঠেছে।