মঙ্গলবার

৩ নভেম্বর, ২০২৬ ১৯ কার্তিক, ১৪৩৩

বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়ার পর হেরোইন সেবনে মাঠে যান তাহসিফ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩ নভেম্বর, ২০২৬ ০৮:০৪

শেয়ার

বান্ধবীর সঙ্গে ঝগড়ার পর হেরোইন সেবনে মাঠে যান তাহসিফ
ছবি সংগৃহীত

বিমান বাহিনীর চাকরিচ্যুত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর ঘটনায় চার দিনের রিমান্ডে থাকা তাঁর জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া তথ্য যাচাই করছে টঙ্গী নৌ পুলিশ। দীপের দাবি, বান্ধবীর সঙ্গে বিরোধের জেরে হেরোইন সেবনের উদ্দেশ্যে তাহসিফ টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠে যান। সেখানে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করার সময় নদীতে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে। তবে তাহসিফকে নদীতে পড়ে যেতে দেখেননি বলে জানিয়েছেন দীপ।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, রাত ১টা ২০ মিনিটের দিকে দীপ মাঠ থেকে একা বের হয়ে আসেন। এর ১৫ মিনিট পর রাত ১টা ৩৫ মিনিটে তাহসিফ তাঁর মাকে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে রওনা হয়েছেন বলে জানান। ফলে ঠিক কীভাবে নদীতে পড়ে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

বান্ধবীর সঙ্গে বিরোধ নিয়ে বারে ঝগড়া

তদন্তসংশ্লিষ্ট নৌ পুলিশের সূত্র জানায়, দীপের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রিমান্ডে থাকা তাঁর বান্ধবীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাহসিফের সঙ্গে ওই নারীর পরিচয়, তাঁদের সম্পর্ক, ঘটনার দিন নেস্ট বারে কী ঘটেছিল এবং তাঁদের মধ্যে কী কথোপকথন হয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করছেন তদন্তকারীরা। দীপ ও ওই নারীর বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হচ্ছে।

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট টঙ্গী নৌ পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই নারী কিছুদিন আগে অন্য এক যুবকের বাসায় ইয়াবা সেবন করতে গিয়েছিলেন। সেখানে ওই যুবকের সঙ্গে তাঁর শারীরিক ঘনিষ্ঠতা হয়। বিষয়টি জানতে পেরে তাহসিফ ২৭ অক্টোবর তাঁকে ফোন করে দেখা করতে বলেন।

পরে তাঁকে নিয়ে উত্তরা সোনারগাঁ জনপথ সড়কের নেস্ট বারে যান তাহসিফ। সেখানে তিনি কর্তৃপক্ষকে স্যাড সং বাজাতে বলেন। এরপর ওয়েটাররা তাঁদের মদ পরিবেশন করেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা তাঁরা মদ পান করেন। ওই সময় দীপও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন।

মদ্যপানের একপর্যায়ে অন্য এক যুবকের সঙ্গে ওই নারীর ইয়াবা সেবন ও রাত কাটানোর বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেন তাহসিফ। এ নিয়ে দুজনের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে তাহসিফ তাঁকে বলেন, তুমি তো ইয়াবা খেয়েছ, আমি এর চেয়েও বড় মাদক হেরোইন খাব। এরপর তিনজনই বার থেকে বের হয়ে যান।

বার থেকে বেরিয়ে তাহসিফ নিজের মোটরসাইকেলে ওই নারীকে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে তাঁর বাসায় পৌঁছে দেন। দীপও নিজের মোটরসাইকেলে সেখানে যান। তাঁদের বাসা সামনাসামনি। দীপের দাবি, শুধু ওই দিনই নয়, তাঁরা প্রায়ই বিভিন্ন বার ও রেস্তোরাঁয় যেতেন এবং ওই নারীও তাঁদের সঙ্গে থাকতেন।

ওই নারীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে তাহসিফ ও দীপ নিজেদের মোটরসাইকেলে টঙ্গীর মাজার বস্তিসংলগ্ন মাঠের উদ্দেশে রওনা হন। সেখানে পৌঁছে বস্তির কাছের একটি দোকানের সামনে মোটরসাইকেল রেখে গলি দিয়ে মাঠে যান তাঁরা।

পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে দৌড়ে পালানোর দাবি

দীপের ভাষ্য অনুযায়ী, মাঠে তখন আরও অনেক লোকজন ছিলেন। তাঁদের বেশির ভাগই স্থানীয় মাদকসেবী ও কারবারি। সেখানে গিয়ে তাহসিফ হেরোইন কিনে সেবন করেন। বারে মদ্যপানের পর হেরোইন সেবন করায় তাহসিফ নিজের ওপর অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে দাবি করেন দীপ।

কিছুক্ষণ পর টহল পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে স্থানীয় মাদক কারবারিরা পালিয়ে যান। দীপও দৌড়ে নদীর পাড়ের দিকে চলে যান। তাঁর দাবি, নদীর ২৯ নম্বর পিলারের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন তিনি। দুই থেকে তিন মিনিট পর দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে ঘিরে ধরেন।

পুলিশ সদস্যরা তাঁর নাম-পরিচয় ও ঠিকানা জানতে চাইলে তিনি নিজের পরিচয় দিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসার ঠিকানা জানান। মোহাম্মদপুরে বাসা হলে এত রাতে সেখানে কেন এসেছেন, পুলিশ সদস্যদের এমন প্রশ্নের জবাবে দীপ জানান, তিনি ক্যাপ্টেন তাহসিফের বন্ধু এবং একটি কাজে সেখানে এসেছেন।

পরে পুলিশ সদস্যরা তাঁকে বাসায় চলে যেতে বলেন। দীপের দাবি, এরপর তিনি তাহসিফের ফোনে একাধিকবার কল করলেও প্রতিবারই ফোন বন্ধ পান। পরে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন।

মাঠে যেতে নিষেধ করেছিলেন তিন নারী

ঘটনার রাতের টঙ্গীর মাজার বস্তির একটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, তাহসিফ ও দীপ মোটরসাইকেল পার্ক করে একটি গলি দিয়ে তুরাগ তীরের মাঠের দিকে যাচ্ছেন। এ সময় তিন নারী তাঁদের সেখানে যেতে নিষেধ করেন। তাঁরা বলেন, তোমরা চলে যাও। তখন তাহসিফ ইংরেজিতে দীপকে বেশি কথা না বলে হাঁটতে বলেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তাহসিফের মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। সবকিছু যাচাই করে প্রাথমিকভাবে তাঁদের ধারণা, এটি হত্যাকাণ্ড নয়, দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হতে পারে। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে সবাই দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করার সময় তাহসিফও সরে যেতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পানিতে পড়ে যেতে পারেন।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, দীপ ও ওই নারী রিমান্ডে রয়েছেন। তাঁদের এ বিষয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। দীপের বক্তব্য ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রাথমিক তদন্তে মৃত্যুটিকে হত্যাকাণ্ড বলে মনে হচ্ছে না। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনের অপেক্ষায় তদন্তকারীরা

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ির ইন্সপেক্টর ফিরোজ উদ্দিন জানান, তাহসিফ মাদক সেবন করেছিলেন কি না কিংবা তাঁর শরীরে কোনো বিষ প্রয়োগ করা হয়েছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে জানা যাবে।

এ জন্য তাঁর শরীরের রক্ত, পাকস্থলী, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গের নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে। ভিসেরা ও রক্তের নমুনাও পরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হয়েছে।