সোমবার

২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৮ কার্তিক, ১৪৩৩

সৌদি প্রবাসীদের জন্য সরকারের জরুরি নির্দেশনা

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ নভেম্বর, ২০২৬ ২২:০৭

শেয়ার

সৌদি প্রবাসীদের জন্য সরকারের জরুরি নির্দেশনা
ছবি সংগৃহীত

সৌদি আরবে কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসীদের ভিসা, নিয়োগচুক্তি, ইকামা, বেতন, চাকরি পরিবর্তন, জনসমক্ষে আচরণ, সড়ক নিরাপত্তা, অর্থ লেনদেন ও জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত নির্দেশনা প্রকাশ করেছে সরকার। প্রবাসীদের বৈধভাবে কাজ করা এবং সৌদি আরবের আইন ও সংস্কৃতি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (২ নভেম্বর) নিজেদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে এ নির্দেশনা প্রকাশ করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শ্রমবাজার। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।

ভিসা, নিয়োগচুক্তি ও কাগজপত্র যাচাই

সরকারের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সৌদি আরবে যাওয়ার আগে ভিসা, নিয়োগকর্তা ও নিয়োগচুক্তি ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। বিএমইটি ছাড়পত্র, প্রশিক্ষণ ও মেডিকেল পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। পাসপোর্টসহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিজের হেফাজতে রাখতে হবে এবং দালালের মৌখিক আশ্বাসে টাকা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কাজের উদ্দেশ্যে ভিজিট ভিসায় যাওয়া যাবে না।

ইকামা সঙ্গে রাখা ও Absher অ্যাপে এর মেয়াদ যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। QIWA প্ল্যাটফর্মে নিয়োগচুক্তি ও ওয়ার্ক পারমিট যাচাই করতে হবে। পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ছয় মাস আগে নবায়ন বা পুনরায় ইস্যুর ব্যবস্থা করতে হবে। না বুঝে কিংবা সাদা কাগজে সই বা টিপসই দেওয়া যাবে না। ওটিপি ও পাসওয়ার্ড অন্য কাউকে দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে। ইকামা নবায়নের দায়িত্ব নিয়োগকর্তার, তাই এ জন্য কাউকে টাকা না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বেতন, চাকরি ও শ্রমিকের অধিকার

নিয়োগচুক্তির কপি ও কাজের প্রমাণ সংরক্ষণ করতে হবে। ব্যাংকিং চ্যানেলে বেতন গ্রহণ করে ব্যাংক স্টেটমেন্টও রাখতে হবে। কর্মক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে মকতব আমল-এর ১৯৯১১ নম্বরে অথবা বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

স্কিল ভিসায় কিংবা নিজের নিয়োগকর্তার বাইরে কাজ করা যাবে না। নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ হলে কর্মস্থল থেকে পালিয়ে যাওয়া, কর্মবিরতি, ধর্মঘট কিংবা কাজে বাধা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে QIWA প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বৈধভাবে নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করতে হবে। অনুমোদন পাওয়ার আগে নতুন কাজে যোগ দেওয়া যাবে না। দেশে ফেরার আগে জরিমানা ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আছে কি না, তা যাচাই করতে হবে। ফেরার আগে মোবাইল সিম ও অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।

৪০ হাজার সৌদি রিয়াল বা তার বেশি নগদ অর্থ কিংবা সোনা সঙ্গে থাকলে কাস্টমসে ঘোষণা করতে হবে। ভিসা ইস্যুর বিষয়টি যাচাই না করে বিমানবন্দরে যাওয়া যাবে না। ফাইনাল এক্সিট ভিসার নির্ধারিত মেয়াদ অতিক্রম করা যাবে না। অর্থের বিনিময়ে অন্যের সোনা বা মোবাইল বহন থেকেও বিরত থাকতে হবে।

জনসমক্ষে আচরণ ও সামাজিক শিষ্টাচার

সৌদি আরবে শালীন পোশাক পরা, ভদ্র আচরণ করা, লাইনে দাঁড়ানো এবং বয়স্কদের সম্মান করার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। পুলিশ চাইলে শান্তভাবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে হবে। রাস্তায় থুতু, পানের পিক ও ময়লা ফেলা কিংবা প্রস্রাব করা যাবে না। প্রকাশ্যে ঝগড়া, গালাগালি ও মারামারি এবং জাতি, দেশ বা গায়ের রং নিয়ে কটূক্তি করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।

শিশু, নারী ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে আচরণের ক্ষেত্রেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। অচেনা শিশুকে দূর থেকে সম্বোধন করতে হবে। হারানো শিশু পাওয়া গেলে নিরাপত্তাকর্মী বা পুলিশকে জানাতে হবে। শিশুদের স্পর্শ করা, কোলে নেওয়া কিংবা খাবার দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

নারীদের প্রতি সম্মানজনক আচরণ, ব্যক্তিগত দূরত্ব বজায় রাখা এবং তাঁদের হয়রানি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অপরিচিত নারীর কাছে ফোন নম্বর চাওয়া বা বার্তা পাঠানো যাবে না। মার্কেট বা পার্কের ফ্যামিলি সেকশনে পুরুষদের একা প্রবেশ না করার এবং প্রতিবেশীর বাড়িতে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ বা উঁকি না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাসায় কাজে প্রবেশের ক্ষেত্রেও পুরুষ সদস্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।

ধর্মীয় বিধান ও সংস্কৃতি মেনে চলা

নির্দেশনায় নামাজের সময় কাজ বন্ধ রেখে নামাজ আদায়, রমজানে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে খাওয়া ও ধূমপান থেকে বিরত থাকা, ডান হাতে খাবার গ্রহণ এবং মসজিদে মোবাইল ফোন নীরব রাখার কথা বলা হয়েছে।

ধর্ম, রাজপরিবার ও সরকার নিয়ে মন্তব্য বা পোস্ট করা যাবে না। মিছিল, সমাবেশ ও ধর্মঘটে অংশ নেওয়া, তাবিজ-কবচ, তন্ত্র-মন্ত্র বা কবিরাজি করা এবং মসজিদে কোনো ধর্মীয় সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

ছবি, ভিডিও ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো খবর শেয়ার করার আগে তা যাচাই করতে হবে। শক্তিশালী পাসওয়ার্ড ও দুই ধাপের নিরাপত্তাব্যবস্থা ব্যবহার এবং শুধু অফিসিয়াল অ্যাপ ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশনায় ভিপিএন ব্যবহার থেকে বিরত থাকার কথাও বলা হয়েছে।

অনুমতি ছাড়া শিশু, নারী বা পরিবারের সদস্যদের ছবি তোলা যাবে না। গুজব, অশ্লীল ভিডিও বা মিম ফরোয়ার্ড করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, প্রতিরোধ, আঘাতস্থল ও নিরাপত্তা-সংবেদনশীল স্থানের ছবি বা ভিডিও ধারণ, সংরক্ষণ কিংবা শেয়ার করা যাবে না।

সড়ক নিরাপত্তা ও দুর্ঘটনায় করণীয়

গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে বৈধ লাইসেন্স ও বিমা নিশ্চিত করা, সিটবেল্ট ব্যবহার, গতিসীমা মেনে চলা এবং ট্রাফিক সাইন অনুসরণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। ট্রাফিক জরিমানা বকেয়া রাখা যাবে না এবং লাইসেন্স বা বিমা ছাড়া গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের গাড়ি দুর্ঘটনায় পড়লে ঘটনাস্থল ছেড়ে যাওয়া যাবে না। দুর্ঘটনার পর নাজম ও পুলিশের প্রতিবেদন সংগ্রহ করতে হবে।

দুর্ঘটনা ঘটলে অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৯৯৭ অথবা জরুরি সহায়তায় ৯১১ ও ৯৯৯ নম্বরে ফোন করতে বলা হয়েছে। উদ্ধারকারীদের চলাচলের পথ খালি রাখতে হবে। কেউ দুর্ঘটনার সাক্ষী হলে নিজের দেখা ঘটনা সত্যভাবে জানাতে হবে। প্রাণঝুঁকি না থাকলে আহত ব্যক্তিকে টেনে তোলা যাবে না। দুর্ঘটনাস্থলে ভিড় করা, ছবি বা ভিডিও ধারণ এবং আহত বা মৃত ব্যক্তির মোবাইল ফোন কিংবা টাকা স্পর্শ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।

অর্থ লেনদেন, ঋণ ও সঞ্চয়

প্রবাসীদের শুধু ব্যাংক ও অনুমোদিত এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হুন্ডিতে টাকা পাঠানো যাবে না। প্রতি মাসে কিছু অর্থ সঞ্চয়, বিল ও ঋণ সময়মতো পরিশোধ এবং অনুমোদিত সীমার মধ্যে টাকা পাঠাতে হবে।

নিজের সিম, কার্ড বা অ্যাকাউন্ট অন্যকে দেওয়া যাবে না। অন্যের ঋণের জামিনদার হওয়া কিংবা অন্যের নামে ব্যবসা করা থেকেও বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

কমিউনিটি, বাসস্থান ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা

কমিউনিটির সদস্যদের সঙ্গে সদ্ভাব বজায় রাখা এবং দেশের সুনাম অক্ষুণ্ণ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠান বা সভা আয়োজনের আগে অনুমতির নিয়ম জানতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলতে হবে এবং অন্যের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে গাড়ি পার্কিং করা যাবে না। অনুমতি ছাড়া চাঁদা বা অর্থ সংগ্রহ করা যাবে না। ব্যাচেলর ক্যাম্প বা বাসায় নারী অতিথি আনা, আতশবাজি ফোটানো, গাছ কাটা ও শিকার করা থেকেও বিরত থাকতে হবে।

ওষুধ ও মাদক বিষয়ে সতর্কতা

দেশ থেকে ওষুধ নিয়ে যাওয়ার আগে সৌদি খাদ্য ও ওষুধ কর্তৃপক্ষের (SFDA) অনুমতি নিতে হবে। ওষুধের প্রেসক্রিপশন ও মূল প্যাকেট সঙ্গে রাখতে হবে। অনুমতির জন্য নির্ধারিত লিংক https://cds.sfda.gov.sa।

অন্যের দেওয়া প্যাকেট, ব্যাগ বা ওষুধ বহন করা যাবে না। প্রেসক্রিপশনের বাইরে কিংবা অতিরিক্ত পরিমাণে ওষুধ আনা থেকেও বিরত থাকতে হবে। মদ ও জুয়া থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দিয়ে বলা হয়েছে, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।

স্বাস্থ্য ও কর্মস্থলের নিরাপত্তা

গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কর্মস্থলে হেলমেট, সেফটি বেল্টসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহার এবং বিদ্যুৎ ও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৫ জুন থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সরাসরি রোদে কাজ করা যাবে না। বন্ধ ঘরে চুলা জ্বালিয়ে ঘুমানো এবং বৈদ্যুতিক লাইন বা সকেটে ধারণক্ষমতার বেশি লোড দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।

হজ, উমরাহ, পরিবার ও বিয়ে

নুসুক অ্যাপের মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে হজ, উমরাহ ও জিয়ারত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। অনুমতি ছাড়া হজ করা বা হাজি বহন করা যাবে না। বিয়ে আইনসম্মতভাবে নিবন্ধন এবং সন্তানের জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করতে হবে। গোপন বা নিবন্ধনহীন বিয়ে এবং বিয়ের বাইরে সম্পর্কে জড়ানো থেকেও বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বিপদে পড়লে যেভাবে সহায়তা পাবেন

জরুরি পরিস্থিতিতে ৯১১ ও ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের সহায়তা নিতে হবে। দূতাবাস থেকে অনুবাদ ও আইনি সহায়তাও নেওয়া যাবে। আরবি ভাষায় লেখা কোনো কাগজের বিষয়বস্তু না বুঝে সই করা যাবে না। পুলিশের সঙ্গে তর্ক বা ঝগড়ায় জড়ানো এবং সমস্যা সমাধানের জন্য দালালকে টাকা দেওয়া থেকেও বিরত থাকতে হবে।

জরুরি যোগাযোগের নম্বর

সৌদি আরবের রিয়াদ, মক্কা, মদিনা ও পূর্বাঞ্চলে জরুরি সহায়তার নম্বর ৯১১। অন্যান্য অঞ্চলে ৯৯৯ নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ৯৯৭, অগ্নিনির্বাপণের জন্য ৯৯৮ এবং ট্রাফিক পুলিশের জন্য ৯৯৩ নম্বর দেওয়া হয়েছে। শ্রমসংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে ১৯৯১১ নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে।

বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রমকল্যাণ উইংয়ের নম্বর ৮০০১০০০১২৫ এবং কনস্যুলার সেবার নম্বর ৮০০১০০০১২৬। এ ছাড়া প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারের নম্বর ১৬১৩৫।

বিজ্ঞপ্তির শেষে সৌদি প্রবাসীদের বৈধভাবে অবস্থান, আইন মেনে চলা এবং আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো বিপদে পড়লে এককভাবে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে সরকার।