সোমবার

২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৮ কার্তিক, ১৪৩৩

হাসিনার ফেরার আলোচনা; যেমন ছিলো তার স্বৈরাচারী শাসনামল

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৫:১৪

শেয়ার

হাসিনার ফেরার আলোচনা; যেমন ছিলো তার স্বৈরাচারী শাসনামল
ছবি সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর থেকেই গুঞ্জন ছড়ানো হচ্ছে ডিসেম্বরের মধ্যেই নাকি দেশে ফিরছেন শেখ হাসিনা। তাঁর অনুসারী ও একশ্রেণীর গোষ্ঠী এই বার্তাকে চটকদার প্রচারে পরিণত করে সাধারণ মানুষের মনে কৌতূহল সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে যে, ১৫ বছর ধরে তিনি দেশকে এক মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন, সেই বীভৎস ইতিহাস কি এতই সহজে মুছে ফেলা সম্ভব?

তাঁর কৃতকর্মের ওপর ভিত্তি করেই তুলতে হচ্ছে সেই মূল প্রশ্ন, এই বাংলাদেশ কি তাঁর চটকদার প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রস্তুত, নাকি তাঁর মুখোমুখি হওয়া উচিত স্রেফ কাঠগড়ার? যে ইতিহাস কোনো চটকদার প্রচার দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া সম্ভব নয়।

উন্নয়নের চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনের আড়ালে বাংলাদেশ স্বৈরাচার হাসিনা সরকারের গত ১৫ বছর ধরে পরিণত হয়েছিল এক ভয়ংকর মাফিয়া রাষ্ট্রে।

গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস ও গুম

২০০৯ সালে দিনবদলের সনদ নিয়ে ক্ষমতায় আসা শেখ হাসিনার সরকার, ধাপে ধাপে ধ্বংস করেছে রাষ্ট্রের প্রতিটি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। বিরোধী মত দমন, গুম, খুন, ধর্ষণ, ব্যাংক লুটপাট, আর মেগা প্রজেক্টের নামে মেগা দুর্নীতির মাধ্যমে তিল তিল করে গড়ে তোলা হয়েছিল এক লৌহকঠিন স্বৈরতন্ত্র।

কেন্দ্র থেকে প্রান্ত, সচিবালয় থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম, কোথাও বাদ যায়নি শাসনযন্ত্রের এই নির্মম পেষণ। সেই ১৫ বছরের রুদ্ধদ্বার ইতিহাসের প্রতিটি পাতা, যেখানে প্রতিটি ঘটনার পেছনে লুকিয়ে আছে ক্ষমতার দম্ভ আর বিচারহীনতার চরম আস্ফালন।

ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করার প্রথম হাতিয়ার ছিল গুম বা রাষ্ট্রীয় গুম। মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের গুম বিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপের তথ্যমতে, গত ১৫ বছরে অন্তত ৬৭৭ জন মানুষকে গুম করা হয়েছে। ২০১২ সালের এপ্রিলে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে তার গাড়িচালকসহ বনানী থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এখন পর্যন্ত তাদের খোঁজ মেলেনি। একইভাবে গুম হন চৌধুরী আলম, সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান, কিংবা মীর আহমাদ বিন কাসেম।

ভিন্নমত দমনে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর ভেতরে তৈরি করা হয় কুখ্যাত আয়নাঘর বা জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল । মাসের পর মাস, বছরের পর বছর সেখানে সূর্যের আলো না দেখিয়ে আটকে রাখা হয় নাগরিকদের। সাবেক সেনা কর্মকর্তা হাসিনুর রহমান কিংবা মাইকেল চাকমার মতো ব্যক্তিরা বছরের পর বছর এই বন্দিশালায় অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে নাগরিক নিখোঁজ করার এই সংস্কৃতি ছিল ল্যাটিন আমেরিকার কুখ্যাত স্বৈরশাসকদের চাইতেও ভয়ংকর।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

গুমের সমান্তরালে চলছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। তথ্য বলছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আড়াই হাজারেরও বেশি মানুষকে বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে।

এর সবচেয়ে কুখ্যাত উদাহরণ নারায়ণগঞ্জের সাত খুন। রবিবার (২৭ এপ্রিল) ২০১৪ সালে সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে অপহরণ করে র‍্যাব-১১। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনের কাছ থেকে কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে র‍্যাবের তৎকালীন অধিনায়ক তারেক সাঈদ ও তার সহযোগীরা এই সাতজনকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর পেট কেটে ইট বেঁধে শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেয়।

অন্যদিকে, কক্সবাজারের টেকনাফে ওসি প্রদীপের নেতৃত্বে পুলিশের একচ্ছত্র ডেথ স্কোয়াড গড়ে ওঠে। মাদক বিরোধী অভিযানের নামে সেখানে শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয়, যার চূড়ান্ত শিকার হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। ২০২০ সালের জুলাইয়ে চেকপোস্টে তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যার পর পুলিশের ক্রসফায়ার বাণিজ্য দেশবাসীর সামনে উন্মোচিত হয়।

আর দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে পরিণত করা হয়েছিল ছাত্রলীগের একেকটি টর্চার সেলে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর করে মিছিলে নেওয়া, গেস্টরুমে শারীরিক নির্যাতন এবং সিট বাণিজ্য ছিল অলিখিত আইন।

রবিবার (৬ অক্টোবর) ২০১৯ সালের রাতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বা বুয়েট-এ নেমে আসে চরম বর্বরতা। ভারতের সাথে অসম চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদকে শের-ই-বাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে ডেকে নেয় ছাত্রলীগ নেতারা। টানা ৬ ঘণ্টা ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে পিটিয়ে তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

এর আগে ২০১২ সালে পুরান ঢাকায় প্রকাশ্য দিবালোকে বিশ্বজিৎ দাসকে কুপিয়ে হত্যা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। ক্যামেরার সামনে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ড পুরো জাতিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। একই বছর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সিট ও চাঁদাবাজির দ্বন্দ্বে নিজ দলের ক্যাডারদের হাতেই খুন হন ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ।

গণমাধ্যমের হিসাব বলছে, গত ১৫ বছরে শুধুমাত্র চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্বে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলেই খুন হয়েছেন অন্তত ১২০ জন নেতাকর্মী।

ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার

ত্রাস সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের সবচেয়ে জঘন্য হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে ধর্ষণকে। রবিবার (৩০ ডিসেম্বর) ২০১৮ সালে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাত। নোয়াখালীর সুবর্ণচরে চার সন্তানের জননী এক গৃহবধূকে দলবেঁধে ধর্ষণ করে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা। তার অপরাধ ছিল, তিনি নৌকার বদলে ধানের শীষে ভোট দিয়েছিলেন।

শুক্রবার (২৫ সেপ্টেম্বর) ২০২০ সালে সিলেটের এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে ঘুরতে আসা এক দম্পতিকে জিম্মি করে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। স্বামীকে বেঁধে রেখে স্ত্রীকে টানা কয়েক ঘণ্টা গণধর্ষণ করা হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরেই। একই বছর নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে যুবলীগ ও স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনী এক গৃহবধূর ঘরে ঢুকে তাকে বিবস্ত্র করে বর্বরোচিত নির্যাতন চালায় এবং ভিডিও ধারণ করে চাঁদা দাবি করে।

শিক্ষাঙ্গনেও এই লালসার বিস্তার ছিল ভয়ংকর। ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ নেতা মানিকের ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপনের যে ঘৃণ্য ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, ২০২৪ সালেও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে। মীর মশাররফ হোসেন হলের পাশে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণ করে শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। বিচারহীনতা ও রাজনৈতিক আশ্রয়ের কারণে এই অপরাধগুলো মহামারি আকার ধারণ করেছিল।

স্থানীয় মাফিয়া শাসন ও দুর্নীতি

দুর্নীতি আর ত্রাস শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের প্রতিটি উপজেলা ও গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সমান্তরাল মাফিয়া শাসন।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপথ এবং শিক্ষা প্রকৌশল দপ্তরের প্রতিটি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করত স্থানীয় এমপির সিন্ডিকেট। সাধারণ ঠিকাদারদের দরপত্র ফেলার কোনো সুযোগ ছিল না। প্রতিটি মেগা বা ছোট প্রকল্পে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ কমিশন দেওয়া ছিল অলিখিত নিয়ম। এছাড়া নদী দখল, অবৈধ বালুমহাল এবং হাট-বাজারের ইজারা থেকে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকা চাঁদা উঠত।

নিজেদের এই অবৈধ সাম্রাজ্যের ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে বাধা পেলে নিজ দলের নেতাকেও ছাড় দেয়নি তারা। ২০১৪ সালে ফেনীতে উপজেলা চেয়ারম্যান ও নিজ দলের নেতা একরামুল হককে প্রকাশ্য রাজপথে গাড়ির ভেতর গুলি করে ও পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে মারে স্থানীয় এমপির অনুসারীরা। ২০১৯ সালে বরগুনায় স্থানীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী নয়ন বন্ড ও ০০৭ গ্রুপ দিনে-দুপুরে কলেজের সামনে রামদা দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে রিফাত শরীফকে।

আর প্রশাসনের চোখের সামনেই ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা নির্বাচনগুলোতে কেন্দ্র দখল আর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পাস করার সংস্কৃতি গ্রামীণ গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়।

অর্থনীতি লুটপাট

মানবাধিকার লঙ্ঘনের পাশাপাশি ১৫ বছর ধরে চলেছে দেশের অর্থনীতিকে ফোকলা করার মহোৎসব। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বা সিপিডি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাত থেকে নামে-বেনামে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা লুট করা হয়েছে।

শুরুটা হয়েছিল সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের ৪ হাজার কোটি টাকা এবং বেসিক ব্যাংক থেকে আব্দুল হাই বাচ্চুর নেতৃত্বে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটের মাধ্যমে।

এরপর প্রশান্ত কুমার হালদার বা পিকে হালদার একাই কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যান। তবে সবচেয়ে বড় লুণ্ঠনটি করে এস আলম গ্রুপ। সরকারের শীর্ষ মহলের আশীর্বাদপুষ্ট এই গ্রুপটি ইসলামী ব্যাংকসহ ৮টি ব্যাংক দখল করে হুন্ডি ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার করে সিঙ্গাপুর ও সাইপ্রাসে।

বিদ্যুৎ খাতে ইনডেমনিটি আইন বা দায়মুক্তি আইন পাস করে কুইক রেন্টাল প্ল্যান্ট বসানো হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও দরপত্রবিহীন এসব কেন্দ্রকে ১৫ বছরে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্যাপাসিটি চার্জ বা অলস ভাড়া দেওয়া হয়েছে জনগণের ট্যাক্সের টাকায়।

অন্যদিকে, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল বা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো মেগা প্রজেক্টের ব্যয় বারবার বাড়িয়ে রেন্ট-সিকিংয়ের মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট করা হয়। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি ও টিআইবির তথ্যমতে, এই ১৫ বছরে সব মিলিয়ে দেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। কানাডার টরন্টোতে গড়ে উঠেছে লুটেরাদের বেগমপাড়া, দুবাইতে কেনা হয়েছে হাজারো বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।

নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস

এই সীমাহীন দুর্নীতি ও লুণ্ঠন জারি রাখতে প্রয়োজন ছিল ক্ষমতায় টিকে থাকা। আর তাই সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করা হয় নির্বাচন ব্যবস্থাকে। ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচন, যেখানে ১৫৩ জন সংসদ সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

২০১৮ সালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনকে ব্যবহার করে আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে ফেলা হয়, যা নিশিরাতের নির্বাচন হিসেবে পরিচিতি পায়। এরপর ২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত হয় ইতিহাসের সবচেয়ে হাস্যকর ডামি নির্বাচন, যেখানে নিজেদের দলের নেতাদেরই ডামি বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে একটি পাতানো নির্বাচনের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়।

আর পুলিশ, প্রশাসন এবং বিচার বিভাগকে পুরোপুরি দলীয়করণ করে বিরোধী দলের হাজার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে লাখ লাখ গায়েবি মামলা দিয়ে রাজনীতিকে পুরোপুরি স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়াও, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই পিলখানা বিডিআর সদর দপ্তরে সংঘটিত হয় দেশের ইতিহাসের অন্যতম নৃশংসতম ট্র্যাজেডি। ওই ঘটনায় ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন প্রাণ হারান। বিশ্লেষকদের মতে, দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করা এবং সরকারের ক্ষমতার ভিত্তি সুসংহত করার উদ্দেশ্যেই সুপরিকল্পিতভাবে এই হামলা চালানো হয়েছিল।

একইভাবে, রবিবার (৫ মে) ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়া আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষের ওপর বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়। সমালোচকদের দাবি, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ধারাবাহিক গুম ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে পুরো দেশকে এক চরম ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল।

একইভাবে যুদ্ধাপরাধের নামে, আল্লামা দেলওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ জামায়াত-বিএনপির একাধিক শীর্ষ নেতাকে বিচারিক হত্যা করা হয় বলেও যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে হাসিনার বিরুদ্ধে। সেইসাথে, প্রহসনের বিচারে নির্যাতন করে, তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির তখনকার চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং তার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেন হাসিনা, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে রয়েছে এমন মতামত।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় ছাত্রলীগ।

জুলাই অভ্যুত্থান ও গণহত্যা

কিন্তু ভয়ের এই সাম্রাজ্য শেষ পর্যন্ত ধসে পড়ে ছাত্র-জনতার প্রবল প্রতিরোধের মুখে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন দমনে অতীতের মতোই চরম দমন-পীড়নের পথ বেছে নেয় হাসিনা সরকার।

প্রথমে লেলিয়ে দেয়া হয় ছাত্রলীগকে। এরপর মাঠে নামে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি। মঙ্গলবার (১৬ জুলাই) রংপুরে পুলিশের পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জের গুলিতে শহীদ হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। ১৮ থেকে ২১ জুলাই এবং পরবর্তীতে ৪ ও ৫ আগস্ট সারাদেশে চালানো হয় ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা।

জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয়ের প্রাথমিক প্রতিবেদন এবং স্বাস্থ্য দপ্তরের তথ্যমতে, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, বাড্ডা, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে পুলিশ ও দলীয় ক্যাডারদের স্নাইপার, একে-৪৭ এবং হেলিকপ্টার থেকে ছোড়া গুলিতে প্রাণ হারান শিশু, শিক্ষার্থীসহ ১ হাজারেরও বেশি মানুষ। পঙ্গুত্ব বরণ করেন ১৫ হাজারেরও বেশি সাধারণ নাগরিক। মুগ্ধর মতো তরুণেরা যখন পথে পানি বিলাতে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন, তখন বারুদ আর রক্তের গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে এদেশের আকাশ-বাতাস।

হাসিনা পালায় না ক্ষমতার অহংকারে মত্ত থেকে এই কথাটি তিনি বারবার বললেও, সোমবার (৫ আগস্ট) ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন স্বৈরাচার শেখ হাসিনা। গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে উন্নয়নের চোখধাঁধানো বিজ্ঞাপনের আড়ালে বাংলাদেশ যে এক ভয়ংকর মাফিয়া রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, তারই নির্মম দলিল হাসিনার ১৫ বছরের শাসনকাল।

তাই যখন ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরা কিংবা চটকদার গুজবের বাতাস ছড়ানো হয়, তখন সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের একটাই দাবি, ১৫ বছরের রক্তে রঞ্জিত ইতিহাস পেরিয়ে তিনি যদি দেশে ফেরেনও, তা কোনো বিজয়ের বেশে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের জন্য নয়। তাঁর ফেরা উচিত স্রেফ একজন আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি অমানবিক অপরাধের মুখোমুখি হতে কিংবা ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে।

গুমের শিকার পরিবারগুলোর দীর্ঘশ্বাস, নিহতদের স্বজনের কান্না আর লুট হওয়া সম্পদের হিসেব চুকানো ছাড়া এই দেশে কোনো স্বৈরাচারের স্থান হতে পারে না বলে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছাত্র-জনতা। এই অবস্থায়, বিচার নিশ্চিত হওয়াই এখন গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল দাবি।