সোমবার

২ নভেম্বর, ২০২৬ ১৮ কার্তিক, ১৪৩৩

শ্রমিক আন্দোলনের নামে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২ নভেম্বর, ২০২৬ ১২:৪০

শেয়ার

শ্রমিক আন্দোলনের নামে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে কঠোর ব্যবস্থা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের কঠোর হাতে দমন করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি অভিযোগ করেছেন, পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থক কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিকদের ব্যবহার করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

সোমবার বেলা ১১টার দিকে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণে বোর্ড গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি এবং সরকারের পূর্ববর্তী সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর অন্তর শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ কয়েক সপ্তাহ আগেই নেওয়া হয়েছিল। মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম দিয়েছিল। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে নাম দিতে কয়েক দিন সময় লেগেছে। সর্বশেষ গত পরশু রাতে তারা প্রতিনিধির নাম দিয়েছে। শ্রমমন্ত্রী গতকাল যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে মজুরি বোর্ড গঠন করেছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, বিগত কিছুদিন ধরে পতিত স্বৈরাচারী শক্তির সমর্থিত কিছু পক্ষ নিরীহ শ্রমিক ভাইবোনদের ব্যবহার করে অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে। শ্রমিকদের জন্য গঠিত মজুরি বোর্ড গতকাল গঠন করা হয়েছে। হয়তো আজই বোর্ডের প্রথম সভা হতে পারে, অথবা খুব স্বল্পতম সময়ের মধ্যে তারা বসবেন। আলাপ-আলোচনা হবে এবং যথাসম্ভব দ্রুত শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি নির্ধারণ করে ঘোষণা করা হতে পারে।’

মজুরি নির্ধারণের সময়সীমা প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ডিসেম্বর পর্যন্ত এমনিতেই সময়সীমা আছে, তিন বছর পূর্ণ হতে। আশা করি, তারা সব পক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নিম্নতম মজুরি ঠিক করতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা ও পরামর্শ দিয়েছেন, যাতে শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ হয়, তাদের জীবনমানের উন্নতি হয়। সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সহানুভূতির সঙ্গে মজুরি নির্ধারণ করা হবে। উভয়পক্ষের আলোচনা এবং বাস্তবতার নিরিখে এটি নির্ধারিত হবে।’

শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও সহিংসতার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘এখানে অসন্তোষের কিছু নেই। বিগত কয়েক দিন ধরে যেসব সহিংস ঘটনা ঘটেছে এবং কয়েক সপ্তাহ ধরে সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ করে আগুন জ্বালিয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে, এর পেছনে যারা ইন্ধন দিচ্ছে, তারা চিহ্নিত হয়েছে। দুঃখজনক হলো, কিছু শিল্পমালিকও এর সঙ্গে জড়িত আছেন। কিছু শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে যারা কাজ করছেন, তারা শ্রমিকদের কল্যাণ চান কি না, সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। এসব লোকজন অস্থিরতা ও সহিংসতা সৃষ্টি করে রাস্তায় আন্দোলনের নামে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির পাঁয়তারা করছেন, যা কোনোভাবেই শ্রমিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলে দিতে চাই, যারা শ্রমিক আন্দোলনের নামে শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত, আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এবং দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির ষড়যন্ত্র করছে, তাদের কঠোর হাতে দমন করা হবে। আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গতকালই এ রকম কিছু ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডের ভিডিও ফুটেজসহ বিভিন্ন প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে। অডিও, ভিডিও এবং সহিংস ঘটনার সচিত্র ক্লিপ রয়েছে, আপনাদের কাছেও আছে।’

সরকারের অবস্থান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এই সরকার শিল্পবান্ধব, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যবান্ধব সরকার। রপ্তানি বৃদ্ধি, দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য আমরা সব পদক্ষেপ নেব। একই সঙ্গে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শ্রমিকদের কল্যাণ ও স্বার্থ সংরক্ষণেও সব পদক্ষেপ নেয়া হবে। আমরা এ লক্ষ্যেই এগিয়ে যাব। আমরা সবার সহযোগিতা চাই। আজ বিকেল তিনটায় শ্রমিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলব। সকালে মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি।’

শ্রমিক আন্দোলনে প্রকৃত শ্রমিকদের বাইরের লোকজনের সম্পৃক্ততা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা শিল্পমালিকদের সহযোগিতা চেয়েছি। তারা আমাদের সহযোগিতা করবেন। কিছু শিল্পমালিক ও শিল্পকারখানা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানের তালিকা আমাদের দেওয়ার কথা বলেছেন তারা। অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা করছে—এমন শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের নামের তালিকাও চাওয়া হয়েছে।’

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠন শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কাজে লিপ্ত থাকতে পারে না। যারা অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, তাদের মধ্যে পতিত শক্তির কিছু লোক রয়েছে। তারা শ্রমিক নয়। প্রকৃত শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা কখনোই নিজেদের কর্মসংস্থান বিনষ্ট হোক, তা চাইতে পারেন না। আমরা বিশ্বাস করি, গত কয়েক দিনে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টার সঙ্গে প্রকৃত কোনো শ্রমিক বা শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ জড়িত নন। ভুলক্রমে কেউ জড়িত হয়ে থাকলে তাদের এসব কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাব। কারণ, আমরা কঠোরভাবে এসব দমনের চেষ্টা করব।’

অস্থিরতা সৃষ্টির পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘যারা যেভাবেই হোক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে, কোনো ঘৃণ্য রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য সীমান্তের ওপার থেকে ইশারায় যা করার চেষ্টা করছে, তা আমরা প্রতিহত করব।’

শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা নিয়ে আগাম সতর্কবার্তা এবং সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘প্রস্তুতি ছিল। শ্রম মন্ত্রণালয় ও শ্রমমন্ত্রী সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছেন। শ্রমিকদের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিদের নাম আরও আগে পেলে মজুরি বোর্ডও আগে গঠিত হতো। আমরা সবকিছু আলোচনা ও সমঝোতার মধ্য দিয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছি। এই সময়টা দেয়া হয়েছিল, যাতে শ্রমিক সংগঠন, শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ও শিল্পমালিকেরা বুঝতে পারেন, ভেতরে আসলে কী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এখন সবার কাছে বিষয়টি পরিষ্কার। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যাতে সহিংসতা ও অস্থিরতা সৃষ্টির যেকোনো পাঁয়তারা কঠোর হাতে দমন করা হয়।’

পোশাকশিল্পের মালিকদের সঙ্গে সরকারের সমন্বয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর শীর্ষ নেতারা এসেছিলেন। তাদের সঙ্গে আমাদের সব সময় যোগাযোগ ও আলোচনা ছিল। এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ বিভাগের পক্ষ থেকে ফোকাল পয়েন্ট নির্ধারণ করা হয়েছে। তারাও আমাদের ফোকাল পয়েন্ট ঠিক করে দিয়েছেন। সার্বক্ষণিক যোগাযোগ থাকবে।’

তিনি বলেন, ‘সুরক্ষা অ্যাপস নামে আমাদের একটি অ্যাপস আছে। নির্বাচন, পূজাসহ বিভিন্ন সময়ে এটি ব্যবহার করা হয়, যাতে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো জায়গার তথ্য সবাই একসঙ্গে আদান-প্রদান ও শেয়ার করতে পারেন। এর মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করা হবে। পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে একটি কন্ট্রোল রুম স্থাপনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করব।’

কিছু শিল্পমালিকের বিরুদ্ধে অস্থিরতায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কেউ কেউ শিল্পমালিকেরাও এর সঙ্গে জড়িত আছেন। তাদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাদের কেউ কেউ কোনো সময় সংসদ সদস্য, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এসব শিল্পমালিক অস্থিরতার পেছনে কাজ করছেন বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে এবং তা প্রমাণিত হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা কোনোভাবেই চাই না, কোনো মিল বা শিল্পকারখানা বন্ধ হোক। কারণ, এর সঙ্গে শ্রমিকদের রুটি-রুজির বিষয় জড়িত। এ জন্য শ্রমিক সংগঠনের সব নেতৃবৃন্দকে আজ আহ্বান জানিয়েছি। বিকেল তিনটায় তাদের সঙ্গে কথা বলব। তারা যেন শ্রমিকদের কল্যাণে কাজ করেন, কেউ যেন কর্মহীন হয়ে না পড়েন। আমরা এক মুহূর্তের জন্যও কোনো শিল্পকারখানা বন্ধ হোক, তা চাই না।’

ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘কিসের আপনারা ডিসেম্বর, ডিসেম্বর করছেন? ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। বিজয় দিবস উপলক্ষে আমাদের কর্মসূচি থাকবে। পলাতক আসামিরা ডিসেম্বর বা জানুয়ারিতে কিছু করার চেষ্টা করলে, সেটা তাদের জিজ্ঞেস করেন। আমরা চাই, সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও পতিত ফ্যাসিবাদী শক্তির লোকজন যেখানেই থাকুক, দ্রুত দেশে ফিরে আসুক। তাদের আইনের আওতায় এনে সুবিচার নিশ্চিত করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনাসহ সাজাপ্রাপ্ত ও দণ্ডিত ব্যক্তিদের ফেরত আনার জন্য প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, তারা যে দেশে আশ্রয় নিয়েছেন, সেই দেশের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন জানানো হয়েছে। ডিসেম্বর কেন, আজই যদি তাদের ফেরত আনা হয়, তাহলে আইনের আওতায় আনা হবে এবং আদালতের রায় অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। ডিসেম্বর, ডিসেম্বর বলে হাইপ তোলে তাদের পলাতক নেতাকর্মীদের একটু বুস্টআপ করার চেষ্টা করছে, সেটা কখনো সাকসেসফুল হবে না।’