ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সাউরি। বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পালানোর সময়কার আলোচিত সেই ভিডিও ধারণ করেছিলেন বলে, নানা আলোচনা রয়েছে। তবে, মতামত রয়েছে ভিডিও ধারণ নয়, বরং আলোচিত ওই ভিডিও ছড়িয়ে দেয়ায় ভূমিকা ছিলো তাহসিফের। অথচ, বিমানবাহিনীর সেই আলোচিত সাবেক কর্মকর্তার মৃত্যুকে ঘিরেই এখন দানা বেঁধেছে রহস্য।
মরদেহ উদ্ধার ও প্রাথমিক তথ্য
গত ২৮ অক্টোবর বুধবার, রাজধানীর উত্তরখানের রাজাবাড়ী এলাকার তুরাগ নদীর ঘাট থেকে নৌপুলিশ উদ্ধার করে তাহসিফের মরদেহ। উদ্ধারের পরপরই পুলিশ একটি সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। সেখানে তাহসিফের শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়। তবে তাঁর নাক দিয়ে রক্ত বের হওয়ার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া যায়।
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকেই সাবেক এই বিমানবাহিনী কর্মকর্তার মৃত্যু ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয় নানা আলোচনা। সামনে আসতে থাকে একের পর এক প্রশ্ন। স্বাভাবিক মৃত্যু, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রহস্য? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সামনে আসে ঘটনার আগের দিনের নানা তথ্য।
ঘটনার সূত্রপাত ও বন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ
ঘটনার সূত্রপাত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সন্ধ্যায়। জানা গেছে, বন্ধুর ডাকে বাসা থেকে বের হন কে এম তাহসিফ সাউরি। বাসার সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বন্ধু দীপের সঙ্গে পৃথক মোটরসাইকেলে করে বেরিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আর বাসায় ফেরেননি তাহসিফ। অবশেষে পরদিন তুরাগ নদ থেকে উদ্ধার করা হয় তাঁর মরদেহ।
বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার মৃত্যুর আগে সর্বশেষ তাঁর বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি সামনে আসায়, সন্দেহের তীর এখন তাঁর দিকেই। আর সেই সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছে দীপের একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য।
প্রথমে এক অডিও বার্তায় তিনি দাবি করেন, রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়ার পরই উত্তরা হাউসবিল্ডিং এলাকা থেকে তাঁরা আলাদা হয়ে যায়।
তবে, পরবর্তীতে সন্দেহের জেরে তাহসিফের বাইক উদ্ধারের স্থানে পুলিশের হেফাজতে দীপকে নিয়ে যাওয়ার পর, তাঁর বক্তব্য মুহূর্তেই পাল্টে যায়। সেখানে তিনি দাবি করেন, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফ নদীতে ঝাঁপ দেন।
তবে, পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তাহসিফের নদীতে ঝাঁপ দেয়ার বিষয়টিকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করেছেন তাঁর বাবা এনায়েতুল করিম।
এমনকি তাহসিফের সাঁতারের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ ছিল বলেও দাবি তাঁর বাবার।
অন্যদিকে, মৃত্যুর আগে, বাবার কাছে নিজের প্রাণের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথাও জানিয়েছিলেন বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তা।
হত্যা মামলা ও গ্রেপ্তার
এদিকে, তাহসিফের বাবা এই রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনায় ৩০ অক্টোবর শুক্রবার রাতে উত্তরখান থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। এমনকি ৩১ অক্টোবর শনিবার এই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়, তাহসিফের বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে। এ ঘটনায় আদালত দীপের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে।
লাশ নদীতে পাওয়ায়, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে এ বিষয়ে নৌপুলিশের ডিআইজি নওরোজ হাসান তালুকদারের বক্তব্য নিতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রহস্যে ঘেরা এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তে সময় লাগবে বলে জানিয়েছে পিবিআই। এ নিয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে চান না বলে জানিয়েছেন, পিবিআই এর এডিশনাল ডিআইজি।
নদীর স্রোত ও দূরত্ব নিয়ে প্রশ্ন
তবে, রহস্যের জট যেন খুলছেই না। দীপের দাবি, ইজতেমার মাঠসংলগ্ন এলাকা থেকে তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন তাহসিফ। অথচ তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয় ঘটনাস্থল থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে উত্তরখানের রাজাবাড়ী ঘাটে। এদিকে, হেমন্তের শুষ্ক আবহাওয়ায় তুরাগের পানি অনেকটাই কমে এসেছে। নদীতে দৃশ্যমান স্রোতও তেমন নেই। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, এমন পরিস্থিতিতে এক রাতের মধ্যে স্রোতহীন নদীর পানিতে ভেসে একজন প্রশিক্ষিত সাঁতারুর মরদেহ কীভাবে তিন কিলোমিটার দূরে পৌঁছাল? নদীর পানির স্বাভাবিক প্রবাহের সঙ্গে এই দূরত্বের হিসাব কি মিলছে? নাকি এই ঘটনাপ্রবাহের আড়ালে রয়ে গেছে আরও কোনো অজানা তথ্য?
আপত্তিকর ভিডিও ও অন্যান্য আলোচনা
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে না পেতেই বিমানবাহিনীর এই সাবেক কর্মকর্তাকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে একটি আপত্তিকর ভিডিও। সেখানে, ২৭ অক্টোবর ঘটনার দিন তাহসিফকে এক নারীর সাথে বারে প্রবেশ করতে দেখা যায়। সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন বন্ধু দীপও।
তবে তাহসিফের বাসায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তাঁর বিষয়ে, ইতিবাচক মন্তব্যই পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, সাউরির এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের সচেতন মহল। পাশাপাশি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন এবং বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে তাঁরা।
হাসিনার পালানোর ভিডিওর সঙ্গে যোগসূত্রের আলোচনা
তাহসিফের মৃত্যু নিয়ে যখন উদ্বিগ্ন দেশ, ঠিক তখনই নতুন করে সামনে আসে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে দেশত্যাগের সেই আলোচিত ভিডিও। ধারণা করা হয়, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের ওই ভিডিও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কে এম তাহসিফ সৌরিই ধারণ করেছিলেন। এমনকি এই ভিডিওর কারণেই তাঁকে বিমানবাহিনী থেকে জোরপূর্বক অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল বলে সমালোচনা রয়েছে। আর সেই ঘটনার জেরেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছে বলেও অনেকে মনে করছে। কেউ কেউ আবার মনে করছে, ব্যক্তিগত শত্রুতার জেরেও হত্যা করা হতে পারে তাহসিফকে।
বিমানবাহিনীর সাবেক এই কর্মকর্তার মৃত্যু কেবল রহস্যই নয়, রেখে গেছে একাধিক প্রশ্ন। স্রোতহীন, শুষ্ক একটি নদীতে কীভাবে তিন কিলোমিটার দূরে পৌঁছাল তাঁর মরদেহ? কেন বন্ধুর বক্তব্যে বারবার পরিবর্তন? পুলিশের ধাওয়ার মুখে নদীতে ঝাঁপ দেয়ার দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কতটা মিল? মৃত্যুর আগে বাবার কাছে প্রাণের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা কেন জানিয়েছিলেন তাহসিফ? আর শেখ হাসিনার দেশত্যাগের সেই আলোচিত ভিডিওর সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না? হয়ত তদন্তই বলে দিবে এসব প্রশ্নের উত্তর।
আরও পড়ুন:







