শনিবার

৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬ কার্তিক, ১৪৩৩

৯ গুলির দাবি, তদন্তে আহত হওয়ার প্রমাণ পায়নি পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫:৫১

শেয়ার

৯ গুলির দাবি, তদন্তে আহত হওয়ার প্রমাণ পায়নি পুলিশ
ছবি সংগৃহীত

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শরীরে নয়টি গুলি লাগার দাবি করে ভুয়া চিকিৎসাপত্রের মাধ্যমে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৮৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা মামলা করার অভিযোগ পেয়েছে পুলিশ। তদন্তে মামলার বাদী নূর হোসেন ঘটনার দিন আহত হননি বলে উঠে এসেছে। চিকিৎসার নথিপত্রও জাল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ মামলার ৮৪ আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আশরাফুল হকের আদালতে প্রতিবেদনটি জমা দেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক উক্যমং রাখাইন। সম্প্রতি বিষয়টি আদালতের নজরে এলে নথি পর্যালোচনা করে বাদীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারির আদেশ দেন ম্যাজিস্ট্রেট। আগামী ১ ডিসেম্বর মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে।

এজাহারে নয়টি গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি

মামলার নথিপত্র ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এজাহারে নূর হোসেন দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বিকেলে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ময়ূর ভিলা এলাকায় গণআন্দোলনে অংশ নেওয়ার সময় তিনি নির্বিচার হামলার শিকার হন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, পিঠে ছয়টি, বাঁ পায়ের হাঁটুর ওপরে দুটি এবং ডান পায়ের হাঁটুর পাশে একটি গুলি লাগে। এতে তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়েন।

এজাহারে আরও বলা হয়, পরে আসামিরা তাঁকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে আসামিদের ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।

এসব অভিযোগে ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৭৬ জনের নাম উল্লেখ করে হত্যাচেষ্টা মামলা করেন নূর হোসেন।

চিকিৎসাপত্রে মিলেছে একাধিক অসংগতি

পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এজাহারের সঙ্গে নূর হোসেন বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসার যেসব ব্যবস্থাপত্র ও কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন, সেগুলো জাল। হাসপাতালের মূল রেজিস্টার ও নথিপত্র যাচাই করে তদন্ত কর্মকর্তা ওই তারিখে নূর হোসেন নামের কোনো ব্যক্তির চিকিৎসা নেওয়ার তথ্য পাননি।

তদন্তে দুটি গুরুতর অসংগতি পাওয়া যায়। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা হাতে লিখে ব্যবস্থাপত্র দিলেও নূর হোসেনের জমা দেওয়া নথিটি ছিল কম্পিউটারে টাইপ করা। অন্যদিকে, ব্যবস্থাপত্রে থাকা ক্যাশ মেমো নম্বরটি আব্দুস সাত্তার নামের ৫৪ বছর বয়সী এক রোগীর নামে বরাদ্দ ছিল। নথিতে উল্লেখ করা পেশেন্ট আইডি নম্বরটিও জুয়েল নামের ৩২ বছর বয়সী অন্য এক ব্যক্তির।

এ ছাড়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আহত ব্যক্তিদের তালিকা নিয়ে সরকারের প্রকাশিত আনুষ্ঠানিক গেজেটেও নূর হোসেনের নাম পাওয়া যায়নি।

তদন্ত কর্মকর্তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বাদী বাস্তবে আহত না হয়েও অসৎ উদ্দেশ্যে আহত হওয়ার মিথ্যা ঘটনা সাজিয়ে মামলাটি করেছেন।

৮৪ আসামির অব্যাহতির সুপারিশ

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মামলা দায়েরের পর অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা আট আসামিকে বিভিন্ন সময়ে এ মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট বা গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছিল। তবে এজাহারের ভিত্তিতে নতুন করে কাউকে সরাসরি আটক করা হয়নি।

তদন্তে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা না পাওয়ায় শেখ হাসিনা ও ওবায়দুল কাদের ছাড়াও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সলিমুল্লাহ সলু, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি রিয়াজ মাহমুদ, সাবেক সহসভাপতি সলিম উল্লাহ পাটোয়ারী, মিলন হোসেন, মহিলা লীগ নেত্রী ইশরাত জাহান তামান্না ও স্বপ্না খন্দকারসহ মোট ৮৪ আসামির অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে।

বাদীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে যা বলল পুলিশ

মিথ্যা তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় বিচারব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে বাদীর বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, জানতে চাইলে তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক উক্যমং রাখাইন জানান, পুলিশের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে বাদীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার আদালতের রয়েছে।