মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে গিয়ে ধারাবাহিক হামলার শিকার হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। মাদকবিরোধী অভিযান, আসামি গ্রেপ্তার ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে গিয়ে কোথাও চাপাতির কোপে, কোথাও মারধরে আহত হচ্ছেন তাঁরা। অন্যদিকে, বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, মাদক সংশ্লিষ্টতা ও বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ পুলিশের ভাবমূর্তি ও জনআস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধসংক্রান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২১ মাসে হামলায় আহত হয়েছেন ১ হাজার ৪৩ জন পুলিশ সদস্য। এর মধ্যে ২০২৫ সালে ৬০১ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম নয় মাসে ৪৪২ জন আহত হন। সে হিসাবে চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৯ জন পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হয়েছেন। তবে আহতদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া সদস্যের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক হামলায় উদ্বেগ
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার একাধিক ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার রাজধানীর উত্তরা এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৯ পুলিশ সদস্য আহত হন। তাঁদের মধ্যে দুজনকে পিটিয়ে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগের দিন গাজীপুরের জয়দেবপুর রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা চালিয়ে দুই পুলিশ সদস্যকে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। মাদকসহ আটক দুই আসামিকে ছিনিয়ে নিতে এ হামলা চালানো হয়েছিল বলে জানা গেছে।
গত ৭ অক্টোবর খুলনায় দায়িত্ব শেষে ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের ধারালো অস্ত্রের হামলায় গুরুতর আহত হন পুলিশ পরিদর্শক মো. শাহ আলম। তাঁর দুই হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়। বর্তমানে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। গত ১৬ অক্টোবর তাঁকে দেখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার নির্দেশনা দেন।
আইজিপি বলেন, হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ অভিযান চলছে। পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ছাড়া সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সদস্য এসআই আলতাফ হোসেনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বাহিনীর সদস্যদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। রাজধানীর রায়েরবাজারে মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় চার পুলিশ সদস্য আহত হন। পটুয়াখালী, ময়মনসিংহ, রাজবাড়ী ও ভোলাসহ বিভিন্ন স্থানেও আসামি গ্রেপ্তার ও অভিযান চালাতে গিয়ে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে।
মাদকবিরোধী অভিযান ও আসামি গ্রেপ্তারে ঝুঁকি
পুলিশ সদর দপ্তরের অনুসন্ধানে মাদকবিরোধী অভিযানকে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া আসামি গ্রেপ্তার, মব পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময়ও হামলার শিকার হচ্ছেন তাঁরা।
গত ২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে ডাকাতি করতে গিয়ে এক পুলিশ সদস্য আটক হয়েছেন। বান্দরবানে চোরাই মোটরসাইকেলসহ আটক হয়েছেন দুই পুলিশ সদস্য। এসব ঘটনা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগকে আরও সামনে এনেছে।
রাষ্ট্রদ্রোহ, ঘুষ, দুর্নীতি, মাদক সংশ্লিষ্টতা ও ধর্ষণসহ বিভিন্ন অপরাধে সাম্প্রতিক সময়ে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এসব ঘটনায় কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছেন। মাদকাসক্তি পরীক্ষায় শনাক্ত হওয়ার পর ১৬৫ জনের বেশি পুলিশ সদস্যকে বিভাগীয় শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে বলে পুলিশ সদর দপ্তরের সূত্র জানিয়েছে।
সংস্কার ও নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, বাহিনীকে আরও কার্যকর, গতিশীল ও জনবান্ধব করতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের উদ্যোগও রয়েছে।
পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রেঞ্জ, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সতর্ক করা হয়েছে। সাম্প্রতিক হামলার পর রাতে একা চলাচল না করার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে, বিভিন্ন স্থানে পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন ও পুলিশ অ্যাসোসিয়েশন।
আরও পড়ুন:







