ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় এক বিচিত্র রাজনৈতিক সমীকরণ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে যাঁরাই বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করেছে কিংবা রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে দিনশেষে তাঁদেরই দিতে হয়েছে চড়া মূল্য।
ঘটনার সূচনা ১৯৭৪ সালে। ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ তীব্র অর্থনৈতিক মন্দা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উর্ধ্বগতিতে তৎকালীন শেখ মুজিবের সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে জনঅসন্তোষ। এরই ধারাবাহিকতায় একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘটে পটপরিবর্তন। সপরিবারে নিহত হন শেখ মুজিবুর রহমান। মারাত্মক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে দলটির রাজনৈতিক অস্তিত্ব।
সেই চরম রাজনৈতিক শূন্যতায় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমান বহুদলীয় রাজনীতির দ্বার উন্মুক্ত করেন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচন ও পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ফিরে পায় রাজনীতি করার আইনি বৈধতা। কিন্তু সেই উদারনীতির প্রতিদান কী ছিল। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে হত্যা করা হয় জিয়াউর রহমানকে। এই ঘটনার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক মহলের ইন্ধন ছিল বলে বহুবার আলোচনা তুলেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অনেকেই জিয়াউর রহমানকে হত্যার জন্য সরাসরি আওয়ামী লীগকে দায়ী করে।
নব্বইয়ের দশকের যৌথ আন্দোলন
ইতিহাসের চাকা ঘোরে নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুগপৎ ও সমান্তরাল আন্দোলন এবং যৌথ কর্মসূচি পালন করেছিল জামায়াতে ইসলামী। ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ যৌথ সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। অথচ দুঃসময়ের সেই আন্দোলনের কথা পরবর্তীতে পুরোপুরি অস্বীকার করে আওয়ামী লীগ।
এরপর আসে ২০০৬ সালের সেই ভয়াবহ রাজনৈতিক সংকট। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র ক্ষমতার লড়াই ও অবিশ্বাস দেশজুড়ে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্ম দেয়। ওয়ান-ইলেভেনের পটপরিবর্তনের ঠিক আগে সেই কঠিন পরিস্থিতিতে নিজেদের রাজনৈতিক শক্তি বাড়াতে এবং সমমনা দলগুলোকে এক ছাতার নিচে আনতে ভিন্ন কৌশল নেয় আওয়ামী লীগ। সেই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকেই ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হিসেবেবে যুক্ত হয়।
এই রাজনৈতিক কৌশল তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে বড় সুবিধা দিলেও মহাজোটের ছায়াতলে থেকে দীর্ঘ সময় রাজনীতি করতে করতে জাতীয় পার্টি নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব হারিয়ে সম্পূর্ণ জনবিচ্ছিন্ন ও বিলুপ্তির পথে এখন।
ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধের পথ
রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের সমীকরণ পুরোপুরি পাল্টে যায় ২০০৮ সালে নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় আসার পর। যে জামায়াতে ইসলামী অতীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনসহ বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগকে রাজপথে রাজনৈতিক সুবিধা দিয়েছিল দুঃসময়ের সেই অবদানের কথা সম্পূর্ণ ভুলে যায় আওয়ামী লীগ। ক্ষমতায় এসেই তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিতর্কিত মামলায় সেই জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের একে একে ফাঁসি কার্যকর করে। একই সাথে দলটির নিবন্ধন ও দলীয় প্রতীক বাতিল করে রাজনৈতিক অঙ্গনে ডেকে আনে নজিরবিহীন এক ধ্বংসাত্মক বিপর্যয়।
সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার মাত্র দেড় মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানা বিডিআর সদর দপ্তরে ঘটে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংসতম ট্র্যাজেডি। ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ প্রাণ হারান ৭৪ জন। বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ মনে করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করতে এবং ক্ষমতার ভিত্তি পাকাপোক্ত করতেই সুপরিকল্পিতভাবে এই আঘাত হানা হয়েছিল।
অন্যদিকে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে আলেম-ওলামা ও সাধারণ মানুষের ওপর বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ এবং গত সাড়ে ১৫ বছরে হাজার হাজার গুম-খুনের মাধ্যমে দেশকে এক ভয়ের উপত্যকায় পরিণত করা হয়েছিল।
জুলাই অভ্যুত্থান ও নতুন আশঙ্কা
পরিশেষে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের বিনিময়ে দেশ স্বৈরাচারমুক্ত হলেও জনপরিসরে এখন ঘুরপাক খাচ্ছে নতুন আশঙ্কা। সচিবালয় থেকে শুরু করে মাঠ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিটি স্তরে এখনও ফ্যাসিবাদের দোসর ও বিভিন্ন মহলের অনুসারীরা লুকিয়ে রয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সচেতন নেটিজেনরা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছে অতীতের ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে সুপ্ত ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলো সুযোগ পেলেই আবারও বিষাক্ত সাপের মতো আঘাত হানতে পারে। তাই কোনো রাজনৈতিক দল বা মহল যেন এই অপশক্তিগুলোকে নতুন করে রাজনৈতিক সুবিধা বা পুনর্বাসিত হওয়ার কোনো ক্ষেত্র তৈরি করে না দেয় বর্তমানে সেটাই সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। অন্তত ইতিহাসের প্রেক্ষাপট বিবেচনাতেও আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে পুনর্বাসিত করা কারো উচিত নয় বলেই মনে করছে সচেতন মহল।
আরও পড়ুন:







