শুক্রবার

৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১৫ কার্তিক, ১৪৩৩

মানবাধিকার রক্ষায় স্বাধীন ‘থার্ড আই’ ও শক্তিশালী কমিশন গঠনের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১১:২৭

শেয়ার

মানবাধিকার রক্ষায় স্বাধীন ‘থার্ড আই’ ও শক্তিশালী কমিশন গঠনের দাবি
ছবি সংগৃহীত

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনিয়ম ও মানবাধিকার লঙ্ঘন প্রতিরোধে স্বাধীন ‘থার্ড আই’ বা তদারকি সত্তা গঠন এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর করার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, গুমের শিকার ব্যক্তি, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে কেজ ইন্টারন্যাশনালের উদ্যোগে আউট অব দ্য শ্যাডো শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনারে বক্তারা এসব দাবি জানান।

গুম ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরলেন মানবাধিকারকর্মী নূর খান

সেমিনারে মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ মসজিদে গিয়ে জামায়াতে অংশ নেওয়া তরুণদেরও লক্ষ্যবস্তু করে গুম করা হতো। দাড়ি-টুপি পরা ব্যক্তিদের উগ্রবাদী আখ্যা দিয়ে তুলে নেওয়া হতো। জুমার নামাজের পর মসজিদ থেকে বের হওয়া তরুণদের বয়স বিবেচনায় আটক করা হতো। পাশাপাশি স্বাধীনভাবে লেখালেখি, মতামত প্রকাশ ও প্রশ্ন তোলার কারণেও অনেককে গুমের শিকার হতে হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ওয়ার অন টেররের অজুহাতে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কার্যালয়ে একাধিক বিদেশি দেশের গোয়েন্দাদের অঘোষিত উপস্থিতি ছিল। জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁদের পাশাপাশি কয়েকজন সাংবাদিকও উপস্থিত থাকতেন। গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা, গুমের পর হত্যা করে নদী ও রেললাইনে মরদেহ ফেলে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। রাজনৈতিক বিরোধী, পাহাড়ি জনগোষ্ঠী ও নারীরাও এসব ঘটনার শিকার হয়েছেন।

নূর খান বলেন, নির্যাতনের চিহ্ন দেখার পরও বিচারকেরা অনেক সময় উদাসীন থাকতেন। কখনো আসামিকে এজলাসে হাজির না করে গাড়িতে রেখেই আদেশ দেওয়া হতো।

মানবাধিকার সুরক্ষায় চারটি সুপারিশ

মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনি ব্যবস্থার ব্যত্যয় বন্ধে চারটি সুপারিশ তুলে ধরেন নূর খান লিটন। এগুলো হলো, আইনবহির্ভূত গ্রেপ্তার বন্ধ করে সাক্ষীর উপস্থিতিতে অভিযোগ জানিয়ে আটক করা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অনিয়ম শনাক্তে স্বাধীন ‘থার্ড আই’ গঠন, বিচারকদের স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালনের বিষয়টি পর্যবেক্ষণে শক্তিশালী কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং বিদ্যমান আইন সংশোধন করে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন ও কার্যকর করা।

এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থায় অভিযোগ জানানোর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম ও ধারাবাহিক সেমিনারের মাধ্যমে জনসচেতনতা বজায় রাখার পরামর্শ দেন তিনি।

সাংবাদিকদের সত্য প্রকাশের আহ্বান আবু সুফিয়ানের

সাংবাদিক আবু সুফিয়ান বলেন, যে পরিচয়েরই মানুষ হোক, সবার মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। শেখ হাসিনার শাসনামলে সাংবাদিক সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। একদল সরকারি বয়ান প্রচার করত, অন্যদল সত্য প্রকাশের চেষ্টা করত। সত্য প্রকাশের চেষ্টা করা সাংবাদিকেরা চাকরি হারানো, হুমকি ও ট্যাগিংয়ের শিকার হতেন।

তিনি আরও বলেন, একশ্রেণির জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখে পদ ও সুযোগ-সুবিধা পেতেন। সত্য নিজের বাবার বিপক্ষে গেলেও সাংবাদিকদের তা প্রকাশ করতে হবে। রাষ্ট্রকে নিয়মিত প্রশ্ন করতে হবে এবং চাকরি হারানোর ভয়ে সত্য প্রকাশ থেকে পিছিয়ে থাকা যাবে না।

জাতীয় ঐকমত্য গড়ার আহ্বান আমান আযমীর

গুম থেকে ফিরে আসা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী বলেন, জাতিসংঘের অধীনে মানবাধিকারের বৈশ্বিক মানদণ্ডের প্রয়োগে অঞ্চলভেদে পার্থক্য রয়েছে। ফিলিস্তিন ও এশিয়ার ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

অধিকার আদায়ে প্রথমে দেশের ভেতরে জাতীয় ঐকমত্য এবং পরে আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, আইনের শাসনের অভাবেই গুম ও খুনের মতো ঘটনা ঘটে। সেনাবাহিনীতে আইন কঠোর থাকায় সেখানে এসব অপরাধ করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর অভিযোগ, অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা র‍্যাব, ডিজিএফআই ও এনএসআইয়ে প্রেষণে যাওয়ার পর এসব কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন।

জঙ্গি সংগঠন তৈরির অভিযোগ মুফতি জসীমউদ্দিনের

গুমের ভুক্তভোগী মুফতি জসীমউদ্দিন রাহমানী অভিযোগ করেন, শেখ হাসিনা ও তৎকালীন গোয়েন্দা পুলিশ নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে জঙ্গি নাটক সাজাত। তাঁর সামনে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে একটি কাল্পনিক সংগঠন তৈরি করে তাঁকে ওই সংগঠনের প্রধান হিসেবে দেখানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, বিচারিক কার্যক্রমেও সংগঠনটির বাস্তব অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

তিনি সদ্ব্যবহার ও গণজাগরণের মাধ্যমে দাওয়াতি পদ্ধতিতে পরিবর্তনের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে বলেন, সন্ত্রাসের মাধ্যমে ইসলাম কায়েম সম্ভব নয়।

জুলুমের আইনি কাঠামো বহাল থাকার অভিযোগ

হেফাজত নেতা হারুন ইজহার বলেন, সরকারের পতনের পরও জুলুমের আইনি কাঠামো বহাল রয়েছে। মুফতি আব্দুল হাই, মুফতি শফিক ও মাওলানা শেখ ফরিদসহ বহু আলেম মিথ্যা মামলায় ফাঁসির দণ্ড নিয়ে কারাগারে রয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্ত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

কেজ ইন্টারন্যাশনালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ রব্বানীর সঞ্চালনায় সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন মাওলানা মীর ইদ্রিস ও শের মুহাম্মদ।