বৃহস্পতিবার

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪ কার্তিক, ১৪৩৩

‘মিথ্যা’ মামলায় ফাঁসিয়ে থামিয়ে দেয়া হয় মতিউর রহমান নিজামীকে!

নিজস্ব প্রতিবেদক বাংলা এডিশন

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৮:২৯

শেয়ার

‘মিথ্যা’ মামলায় ফাঁসিয়ে থামিয়ে দেয়া হয় মতিউর রহমান নিজামীকে!
ছবি সংগৃহীত

মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী একজন আলেম, লেখক ও সংগঠক। বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী নেতা হিসেবেও পরিচিত। ছাত্ররাজনীতি থেকে জামায়াতে ইসলামীর আমির, জাতীয় সংসদ সদস্য থেকে কৃষি ও শিল্পমন্ত্রী—দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় সাদাসিধে জীবনযাপন, ধর্মীয় অনুশাসন ও নীতিনিষ্ঠার ধারক-বাহক হিসেবেই তিনি পৌঁছেছিলেন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার এক গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন

১৯৪৩ সালের ৩১ মার্চ পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মতিউর রহমান নিজামী। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরুর পর সাঁথিয়ার বোয়াইলমারী মাদরাসা এবং পাবনার শিবপুর ত্বহা সিনিয়র মাদরাসায় অধ্যয়ন করেন তিনি। ১৯৬৩ সালে ঢাকা আলিয়া মাদরাসা থেকে ফিকহ বিষয়ে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন মতিউর রহমান নিজামী। পরে ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন বলেও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে।

ব্যক্তিজীবনে মতিউর রহমান নিজামী শামসুন্নাহারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে রয়েছে চার ছেলে ও দুই মেয়ে। এমনকি তাঁর ছেলে নাজিবুর রহমান মোমেন ২০২৬ সালে পাবনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন।

ছাত্ররাজনীতি থেকে জামায়াতের নেতৃত্ব

জানা যায়, ছাত্ররাজনীতির মধ্য দিয়েই দেশের অন্যতম আলোচিত এই ইসলামী নেতার রাজনৈতিক জীবনের বিকাশ ঘটে। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘের সঙ্গে যুক্ত হন নিজামী। ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে দুই মেয়াদে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্র সংঘের কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন বলে তথ্য পাওয়া যায়। আর এই ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বই তাঁকে বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে পরিচিত করে তোলে।

একইভাবে, জামায়াতে ইসলামীর সাংগঠনিক কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশের ইসলামি রাজনীতির এই কেন্দ্রীয় নেতা। ছাত্ররাজনীতির অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দলটির ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরকে সংগঠিত ও সম্প্রসারণে ভূমিকা রাখেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার ধারাবাহিকতায় ২০০১ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমিরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

একই সঙ্গে, ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয় জামায়াতে ইসলামী। ওই নির্বাচনে নিজ নির্বাচনী এলাকা পাবনা-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নিজামী। পরবর্তী সময়ে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় তিনি কৃষিমন্ত্রী এবং পরে শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্বও পান।

মৃত্যুদণ্ডের রায় ও কার্যকর

কিন্তু ইসলামী ঘরানার এই কেন্দ্রীয় নেতাকেও একসময় দাঁড়াতে হয়েছে ইতিহাসের এক কঠিন কাঠগড়ায়। ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের কথিত মামলায় ২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

পরবর্তী সময়ে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগও ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি সেই দণ্ড বহাল রাখে। রিভিউ আবেদন খারিজ হওয়ার পর ২০১৬ সালের ১১ মে রাত ১২টা ১০ মিনিটে, ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এর মধ্য দিয়ে শেষ হয় তাঁর জীবনের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা।

তবে নিজামীর এলাকার বাসিন্দাদের দাবি, ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে তাঁকে অভিযুক্ত করা হলেও সেই অভিযোগ ছিল মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে নিজামীকে ঘিরে ভিন্ন এক দৃষ্টিভঙ্গি।

অস্ত্র মামলায় পরবর্তী রায়

অন্যদিকে, ২০০৪ সালে চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা পৃথক মামলাতেও নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। তবে ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় এবং ২০২৫ সালের ১৪ জানুয়ারি অস্ত্র আইনের পৃথক মামলায় হাইকোর্ট এই মামলার আসামীদের দায়মুক্তি দেয়। এই দুই মামলায় পরবর্তী সময়ে রায় পরিবর্তিত হলেও ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল ছিল। আর সেই দণ্ডই ২০১৬ সালে কার্যকর করা হয়।

সাদাসিধে জীবনযাপন, ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি নিষ্ঠা এবং সাংগঠনিক দক্ষতায় দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী গড়ে তুলেছিলেন নিজস্ব পরিচয়। ইতিহাসের পাতায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী তাই কেবল একটি নাম নন, বরং অনেক বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশের ইসলামী রাজনীতির দীর্ঘ পথচলার এক স্মরণীয় অধ্যায়।