বৃহস্পতিবার

২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ১৪ কার্তিক, ১৪৩৩

ভর্তুকির ফাঁদে সার আমদানি, ব্যাংকঋণে চাপে বিএডিসি

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ০৬:৩৬

শেয়ার

ভর্তুকির ফাঁদে সার আমদানি, ব্যাংকঋণে চাপে বিএডিসি
ছবি সংগৃহীত

সার আমদানির বিপরীতে সরকারের কাছে ১০ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা ভর্তুকি বকেয়া থাকায় ব্যাংকঋণ পরিশোধে চাপের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। সংস্থাটির কাছে সরকারের ভর্তুকির অর্থ আটকে থাকায় নতুন করে সার আমদানির ঋণপত্র (এলসি) খোলার অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বর্তমানে নন-ইউরিয়া সার আমদানির বিপরীতে ব্যাংকগুলোর কাছে বিএডিসির মোট দায় ২২ হাজার ৭৪২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।

সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে ভর্তুকির পাওনা ও ব্যাংকঋণের এই চিত্র তুলে ধরেছে বিএডিসি। সংস্থাটির নথি অনুযায়ী, বকেয়া ঋণ পরিশোধে বিলম্বের কারণে নতুন এলসি খোলার অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আসন্ন বোরো মৌসুমের আগে সময়মতো সার আমদানি, খালাস ও বিতরণ নিশ্চিত করা না গেলে কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু সার কেনার অনুমোদন দিলেই সরবরাহ নিশ্চিত হয় না। আমদানির অর্থায়ন, ব্যাংকঋণ পরিশোধ এবং বন্দর থেকে গুদাম ও মাঠপর্যায়ে সার পৌঁছানোর পুরো প্রক্রিয়া সচল রাখা প্রয়োজন। তাই বোরো মৌসুমের প্রস্তুতির এই সময়ে ভর্তুকির বকেয়া পরিশোধ ও ব্যাংক দায় সমন্বয় জরুরি।

ভর্তুকি বকেয়া ১০ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা

বিএডিসির চেয়ারম্যান ও অতিরিক্ত সচিব মো. আজিজুল ইসলাম গত ১৪ সেপ্টেম্বর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিবের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে জরুরি ভিত্তিতে ভর্তুকির অর্থ ছাড়ের অনুরোধ জানিয়েছেন।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় চুক্তির আওতায় ২০২৫-২৬ ও ২০২৬-২৭ অর্থবছরে আমদানি করা টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের প্রি-অডিট এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পোস্ট-অডিট প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকারি আদেশ (জিও) জারির পরও কিছু অর্থ পরিশোধের অপেক্ষায় রয়েছে। সব মিলিয়ে ভর্তুকির বকেয়া দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ২৪৯ কোটি টাকা।

এর মধ্যে ঋণপত্রের বিপরীতে ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের জন্য ভর্তুকি বাবদ পাওনা ৯ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্থানীয় ব্যয় পরিশোধের জন্য বকেয়া রয়েছে ৪৪১ কোটি টাকা।

আমদানি করা সার সরকার নির্ধারিত দামে কৃষকদের কাছে বিক্রি করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার কেনা, পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় মিলিয়ে প্রকৃত খরচ বিক্রয়মূল্যের চেয়ে বেশি হলে সরকার ভর্তুকির মাধ্যমে সেই ব্যবধান পূরণ করে। কিন্তু ভর্তুকির অর্থ সময়মতো ছাড় না হলে আমদানির জন্য নেওয়া ব্যাংকঋণ পরিশোধ কঠিন হয়ে পড়ে।

বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, সার বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে ট্রাস্ট রিসিটের বিপরীতে ঋণ (এলটিআর) দায়ের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পরিশোধ করা সম্ভব। বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ পরিশোধের জন্য সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভর করতে হয়। ফলে ভর্তুকির অর্থ আটকে থাকলে সংস্থাটির নগদ অর্থপ্রবাহে চাপ বাড়ে।

ব্যাংকের কাছে দায় ২২ হাজার ৭৪২ কোটি টাকা

কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নন-ইউরিয়া সার আমদানির বিপরীতে বিএডিসির মোট ব্যাংক দায় ছিল ২২ হাজার ৭৪২ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে চলমান ঋণপত্রের (এলসি) দায় পাঁচ হাজার ৯৭৪ কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং এলটিআর দায় ১৬ হাজার ৭৬৮ কোটি ১৯ লাখ টাকা।

এলটিআর আমদানি-পরবর্তী ব্যাংক অর্থায়নের একটি ব্যবস্থা। এতে ব্যাংক আমদানির মূল্য পরিশোধ করে পণ্য ছাড়ের সুযোগ দেয়। পরে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান পণ্য বিক্রি বা ব্যবহার থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করে। সময়মতো ঋণ পরিশোধ না হলে ব্যাংকের অর্থ আটকে যায় এবং নতুন আমদানির অর্থায়ন জটিল হয়ে পড়ে।

বিএডিসির জন্য সরকার মোট ৩৮ হাজার ৩৫০ কোটি টাকার কাউন্টার গ্যারান্টি বরাদ্দ রেখেছিল। এর বিপরীতে অবশিষ্ট রয়েছে ১৫ হাজার ৬০৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দ করা গ্যারান্টির বড় অংশ ইতিমধ্যে ব্যবহৃত হয়েছে। তবে অবশিষ্ট গ্যারান্টি থাকলেই নতুন এলসি খোলার জন্য সমপরিমাণ অর্থায়ন পাওয়া যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের অনুমোদন ও অন্যান্য শর্তও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যাংকভিত্তিক হিসাবে বিএডিসির সবচেয়ে বেশি দায় সোনালী ব্যাংকের কাছে। ব্যাংকটির ২৫ হাজার কোটি টাকার গ্যারান্টি সীমার বিপরীতে বিএডিসির মোট দায় ১৮ হাজার ৭৭০ কোটি টাকা। এর মধ্যে এলসি দায় চার হাজার ২৫৮ কোটি টাকা এবং এলটিআর দায় ১৪ হাজার ৫১২ কোটি টাকা। ফলে ব্যাংকটিতে গ্যারান্টির অব্যবহৃত সীমা রয়েছে ছয় হাজার ২৩০ কোটি টাকা।

জনতা ব্যাংকে বিএডিসির মোট দায় এক হাজার ৬৫২ কোটি টাকা। এর মধ্যে এলটিআর দায় এক হাজার ২৭৩ কোটি টাকা। ব্র্যাক ব্যাংকে মোট দায় এক হাজার ১৫৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে এলটিআর দায় ৩৩৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। প্রাইম ব্যাংকে মোট দায় ৬৬২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, যার মধ্যে এলটিআর দায় ৬৪৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। কৃষি ব্যাংকে এলসি দায় রয়েছে ৪৯৭ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

আমদানি ব্যয় বাড়লে বাড়ে ভর্তুকির চাপ

আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম, ডলারের বিনিময় হার ও জাহাজভাড়ার পরিবর্তনে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তাও ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু কৃষকপর্যায়ে সারের বিক্রয়মূল্য সরকার নির্ধারণ করায় আমদানি ব্যয় বাড়লেই সেই অনুপাতে দাম বাড়ানো যায় না। ফলে প্রকৃত আমদানি ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান বাড়লে ভর্তুকির প্রয়োজনও বেড়ে যায়।

এই ব্যবধান পূরণে সরকারি অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে বিএডিসিকে একদিকে আগের আমদানির ঋণ পরিশোধ করতে হয়, অন্যদিকে পরবর্তী মৌসুমের জন্য নতুন সার আমদানির অর্থও জোগাড় করতে হয়। এতে সংস্থাটির নগদ অর্থপ্রবাহে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়।

চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি, উদ্বেগ মাঠপর্যায়ে পৌঁছানো নিয়ে

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর সংসদে দেওয়া হিসাব অনুসারে রবি ও বোরো মৌসুমে সারের মোট চাহিদা ৩৫ লাখ ৮৭ হাজার টন। বিপরীতে প্রস্তুত সরবরাহের পরিমাণ ৫১ লাখ ৭১ হাজার টন। অর্থাৎ প্রস্তুত সরবরাহ চাহিদার চেয়ে ১৫ লাখ ৮৪ হাজার টন বেশি।

গত ১৯ অক্টোবর সরকার ৭০ হাজার টন ইউরিয়া সার কেনার অনুমোদন দিয়েছে। তবে এই অনুমোদন নন-ইউরিয়া সার আমদানির অর্থায়নসংক্রান্ত জটিলতা সমাধানের প্রমাণ নয়। বোরো মৌসুমের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের সার সময়মতো সরবরাহ করতে আমদানি, অর্থায়ন ও বিতরণ ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

খাদ্য উৎপাদনে প্রভাবের ঝুঁকি

দেশের ধান উৎপাদনে বোরো মৌসুমের গুরুত্ব অনেক। জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে ধানের বৃদ্ধি ও ফলন নিশ্চিত করতে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের যথাযথ ব্যবহার প্রয়োজন।

কৃষকের প্রয়োজনের সময় সার সরবরাহ করা না গেলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিকল্প উৎস থেকে সার সংগ্রহ করতে হলে কৃষকের ব্যয়ও বাড়তে পারে।

কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সার আমদানির প্রকৃত ব্যয় এবং সরকার নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের ব্যবধান ভর্তুকির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। কিন্তু ভর্তুকি সময়মতো ছাড় না হলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহে সংকট তৈরি হয় এবং ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ ব্যাহত হয়। এতে নতুন আমদানির অর্থায়নেও চাপ সৃষ্টি হয়। তাই ভর্তুকি ছাড় ও ব্যাংক দায় ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় জরুরি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বোরো মৌসুমে সার সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রথমেই বিএডিসির পাওনা ভর্তুকির হিসাব যাচাই করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অর্থ ছাড় করতে হবে। একই সঙ্গে অর্থ ও কৃষি মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে পুরোনো এলটিআর দায় পরিশোধের ব্যবস্থা করা দরকার।

পাশাপাশি নতুন সার আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ঋণসীমা ও কাউন্টার গ্যারান্টির ব্যবহারযোগ্যতা পর্যালোচনা করতে হবে। আমদানির সময়সূচি, বন্দরে খালাস, গুদামজাতকরণ এবং মাঠপর্যায়ে বিতরণের অগ্রগতিও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

সরকারের কাছে ভর্তুকির অর্থ আটকে থাকা এবং ব্যাংকঋণ পরিশোধে জটিলতা—এই দুই সমস্যার সমাধান না হলে নতুন সার আমদানির অর্থায়নে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। তাই বোরো মৌসুমের আগে ভর্তুকি ছাড়, ব্যাংক দায় সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ে সার সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।