দেশে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও হেফাজতে মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি চায় না সরকার। এসব ঘটনা বন্ধে সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। বেলা আড়াইটায় শুরু হওয়া বৈঠকটি বিকেল ৪টার পর শেষ হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গুমের শিকার ব্যক্তি ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময়ে একটি অভিন্ন বক্তব্য উঠে এসেছে। ভবিষ্যতে যাতে কেউ গুমের শিকার না হন, সে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি গুমসংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত ও সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এখনো ফিরে না আসা ব্যক্তিদের পরিবার সহায়তার জন্য আবেদন করেছে। সরকার ইতিমধ্যে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন করেছে।
সংবিধান ও আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ
নিজেও গুমের শিকার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, দেশে যেন আর কখনো এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেটিই তাঁদের প্রত্যাশা। গুমের সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করার পাশাপাশি বিচারবহির্ভূত হত্যা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর অবসান চান তাঁরা।
তিনি বলেন, এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন এমন বিষয়গুলো সংবিধানে যুক্ত করা হবে। আর আইন বা বিধিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট কাঠামোয় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সংবিধানে গুম প্রতিরোধে নতুন কোনো বিধান যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। এ বিষয়ে সংবিধানে পর্যাপ্ত স্বীকৃতি রয়েছে।
বিরোধী দলের আন্দোলন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা
বিরোধী দলের আন্দোলন প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলন করছে। সংবিধান সংশোধন-সম্পর্কিত বিশেষ কমিটিতে এসে নিজেদের দাবিগুলো তুলে ধরলে কমিটি সেগুলো শুনতে পারত। তবে তারা রাজপথের আন্দোলনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ব্যবস্থা প্রবর্তন করতেই হবে। তবে কী প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করা হবে, এর রূপরেখা কেমন হবে এবং কীভাবে বিতর্ক এড়ানো সম্ভব, তা কমিটি পর্যালোচনা করবে। সংসদে বিল উত্থাপনের পরও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক ও বিভিন্ন প্রস্তাব আসার সুযোগ থাকবে।
ক্রসফায়ার নিয়ে আইজিপির বক্তব্যের ব্যাখ্যা
পুলিশের মহাপরিদর্শকের (আইজিপি) ক্রসফায়ার-সংক্রান্ত বক্তব্যের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পরে ওই বক্তব্যের ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আইনের কঠোর প্রয়োগ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আইজিপি হয়তো অসতর্কভাবে শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এ ধরনের শব্দচয়ন যথাযথ নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, বিএনপি সরকারের আট মাসে কোনো ক্রসফায়ার, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। একটি অভিযোগের বিষয়ে সরকার তদন্ত করেছে এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোকেও স্বাধীনভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোকে তদন্তের আহ্বান জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কেউ সুনির্দিষ্ট ও প্রমাণযোগ্য অভিযোগ দেয়নি বলে দাবি করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
বর্তমান বিরোধী দলের গুমের শিকার ব্যক্তিদের বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেমকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে তিনি বৈঠকে উপস্থিত হননি।
গুমের শিকার পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা ও দাবি
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য হিসেবে সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, আনিছুর রহমান ও তাহসিনা রুশদী বৈঠকে তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তাঁরা নির্যাতন, আইনি সুরক্ষার অভাব এবং ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
বৈঠকে গুম প্রতিরোধ, বিচারব্যবস্থা শক্তিশালী করা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্বীকৃতি দেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবিও জানানো হয়।
বিশেষ কমিটির বৈঠকে সদস্য হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, জয়নুল আবেদীন, তথ্যমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান, প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন।
আরও পড়ুন:







